• Blogtog

এর আগেও বহুবার ভেঙেছে বিদ্যাসাগরের মূর্তি


লেনিন, আম্বেদকার, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ইত্যাদি। একে একে বেশ কিছু মনীষীর মূর্তি ভেঙে পরেছে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে। ফেসবুক, টুইটার সহ বেশ কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়। তবে ১৪ই মে’র আগে পর্যন্ত এই প্রতিবাদ ছিল শুধুমাত্র বিভিন্ন মহলে সীমাবদ্ধ, অন্তত পক্ষে বাংলায়। লেনিনের পক্ষে প্রশ্ন তুলেছিল বামপন্থীরা, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পক্ষে প্রশ্ন তুলেছিল দক্ষিনপন্থীরা এবং কিছু মানুষ পক্ষ নিয়েছিল মূর্তি ভাঙার বিরুদ্ধে। বৃহত্তর সমাজের তরফ থেকে কিন্তু এযাবৎ সাড়া পাওয়া যায়নি তেমন একটা। যতটা পাওয়া গেল ১৪ই মে। গোটা বাংলা, সর্বোপরি গোটা ভারতবর্ষের বাঙালি একসাথে গর্জে উঠলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার বিরুদ্ধে। বেশিরভাগ প্রতিবাদের থেকে, এই প্রতিবাদ যেন একটু ভিন্ন। মানুষ নিজের স্বার্থে নেমে এল রাস্তায়। দল, মত, গোষ্ঠী নির্বিশেষে প্রতিবাদ মিছিল হল শিলিগুড়ি, কলকাতা, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর সহ বেশ কিছু জায়গায়। কারণ একটাই, প্রশ্ন উঠেছে বাঙালি জাতির ওপর।

এবার ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা যাক। ১৪ই মে’র ঘটনার পর প্রতিবাদের দুটো পথ আমাদের কাছে স্পষ্ট। এক, যারা মব কালচার, মূর্তি ভাঙার বিরোধী। দুই, যারা মনীষীর আদর্শ, মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যেমন ঠিক লেনিনের মূর্তি ভাঙায় গর্জে উঠেছে বামপন্থীরা অথবা আম্বেদকারের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে ছিল গুজরাটের দলিত সমাজ। সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে ১৪ই মে’র সন্ধ্যায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা, আঘাত করেছে বাংলা তথা বাঙালিকে। কারণ এতকাল এই মব কালচারের বিরুদ্ধে যারা ছিল নীরব তারা রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে গর্জে উঠলো একসাথে। তাহলে এবার প্রশ্ন আসে এই বাঙালি কারা? তাদের এই রুখে দাঁড়ানো কার বিরুদ্ধে?

অবশ্যই সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগরের প্রতি, যিনি নারীশিক্ষা বিধবা বিবাহের জন্যে লড়াই করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যার অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলা বর্ণমালার বিন্যাস হয়েছিল নবরূপে। সংস্কৃতের অকারণ প্রভাব দূর করে যিনি বাংলা ভাষাকে ভাষাবিজ্ঞানসম্মত করে তুলেছিলেন এবং অতি অবশ্যই যিনি প্রাণহীন বাংলা গদ্যকে দিয়েছিলেন নতুন জন্ম। যার সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠকুর বলেছেন, “তাঁর প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। যদি এই ভাষা কখনো সাহিত্য সম্পদে ঐশ্বর্যশালিনী হইয়া উঠে, যদি এই ভাষা অক্ষর ভাবজননী রূপে মানবসভ্যতার ধাত্রীগণের ও মাতৃগণের মধ্যে গণ্য হয়, যদি এই ভাষা পৃথিবীর শোক-দুঃখের মধ্যে এক নতূন সান্তনাস্থল, সংসারের তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যে এক মহত্ত্বের আদর্শলোক, দৈনন্দিন মানবজীবনের অবসাদ ও অস্বাস্থ্যের মধ্যে এক নিভৃত নিকুঞ্জবন রচনা করিতে পারে, তবেই তাঁহার এই কীর্তি তাঁহার উপযুক্ত গৌরব লাভ করিতে পারিবে। বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যর্থার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্বে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে কলানৈপূণ্যের অবতারণা করেন।” এই বাংলা ভাষার অন্যতম জনকের প্রতি কি আমরা সত্যি শ্রদ্ধাশীল? তাহলে খোদ কলকাতায় কেন পড়ুয়ার অভাবে বন্ধ হতে চলেছে ৭৫টি বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়?  আগামি বছরের মধ্যে হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে আরও ৫০টি বিদ্যালয়। অভিভাবকের চাপে বিদ্যালয়গুলোতে বাংলার স্থান গিয়ে দাঁড়িয়েছে থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজে। তাহলে, বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি আমাদের সত্যি কি আর কোন ভালবাসা অবশিষ্ট আছে? এখান থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, ব্যাক্তিস্বাধীনতার। অবশ্যই ব্যাক্তিস্বাধীনতা সবার আছে বিদ্যাসাগরের প্রতি অবমাননার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন আসে, তাহলে কি আমরা শুধুই ব্যাক্তির প্রতি সন্মান দেখাচ্ছি, তার কাজের প্রতি নয়!

আরেকটি প্রশ্ন উঠবে যে বাংলা থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হলেই যে বাংলা ভাষার প্রতি, সংস্কৃতির অবহেলা করা হবে, এমনটা কিন্তু নয়। একদমই তাই, আমরা সকলেই জানি ভাষা একটা মাধ্যম মাত্র কিন্তু কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন শহরে কি এই দৃশ্য বিরল যে স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে অভিভাবক সহ ছাত্র ছাত্রীরা ক্রমাগত চালাচ্ছে ইংরাজি চর্চা? ইংরাজি ভাষার দরকার কিনা, ভবিষ্যতে এর উপযোগিতার তর্কে যেতে চাইনা, কিন্তু একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখা যায় গত দুই দশক জুড়ে বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির অবহেলা। নইলে কেন এমন দিনের পর দিন বন্ধ হয়ে যাবে বাংলা বিদ্যালয়, কেন সাহিত্য চর্চার প্রতি নেমে আসবে আঘাত, কেন বাংলা বলার অপারগতা হয়ে দাঁড়াবে সমাজে স্মার্ট হওয়ার মাপকাঠি!

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বোধ করি এই বাংলার স্বপ্ন দেখে যাননি। ২০১৯শে পৌঁছে পেছনে ফিরে তাকালে হয়তো আমরা দেখতে পাবো এর আগে বহুবার এমন করেই ভাঙা হয়েছে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, চৈতন্যদেব, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মূর্তি। আর ভেঙেছি আমরাই। বাংলা ভাষার প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা করে।

বারবার প্রশ্ন উঠে আসছে, মনীষীর আদর্শকে কোনদিন মানুষের মন থেকে ভেঙে ফেলা যায় না। তাহলে যেই মনীষীর নিরলস প্রচেষ্টায় সংস্কৃতর প্রকোপ থেকে মুক্ত হয়ে চলিত ভাষায় সাহিত্য ঢুকেছিল বাংলার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে, তার আশীর্বাদ আমরা অবহেলা করি কী ভাবে! একটি একটি সম্প্রদায়ের জাত্যাভিমান সরাসরি নির্ভরশীল তার সংস্কৃতি, তার যাপন, তার ভাষার ওপর। খুব দূরে নয়, মহারাষ্ট্র বা দক্ষিনের রাজ্যগুলোর দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাবো- কেমন করে তারা এখনও আঁকড়ে রয়েছে নিজেদের সংস্কৃতি। এম.কে.স্ত্যালিন তৃণমূলের সমাবেশে এসে পুরো ভাষণ দিলেন তামিলে। শুধু তাই নয়, এখন প্রায় প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতাই দক্ষিণ ভারতে জনসংযোগের জন্যে ব্যাবহার করছে দোভাষীর। ব্যাক্তিগত কারণে ব্যাঙ্গালরে থাকার সুবাদে জানি কান্নাড়রা নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে কতটা সচেতন। একটি ছবি, কেরালা, তামিলনাড়ুতেও। কারণটা স্পষ্ট। ভাষা বহন করে একটি সমগ্র জাতির ইতিহাস, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ।

পৃথিবীর বিখ্যাত সাহিত্যিক তথা দার্শনিক জর্জ স্টেইনারের কথায়-when a language dies, a way of understanding the world dies with it, a way of looking at the world.

কাজেই মনে রাখা দরকার, আমরা যেমন পর কে আপন করে নিতে পেরেছি সহজেই, তেমনি এত সহজেই যেন আপনকে পর না করে ফেলি অজান্তেই। বাঙালির ইতিহাসে কয়েকশ বছরের শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, মেধা, দর্শন, স্বাধীনতা এখনও জ্বলজ্বল করছে গোটা বিশ্বজুড়ে। এই আলোর নীচে আরেকবার দাঁড়িয়ে বরং প্রশ্ন তুলি বাংলা ভাষা থেকে বাঙালির মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণগুলোতে। প্রশাসন, অভিভাবক, বয়োজ্যেষ্ঠরা আর একবার দায়িত্ব নিই নতুন প্রজন্মকে এই আলোয় আরেকবার রাঙিয়ে দিতে। আরও একবার আশাবাদী হই বড় বড় নাম না নিয়ে বরং পাড়ার চায়ের দোকানে এক জ্যেঠুর কথায়। এই তর্কে যখন আমরা সবাই বেশ মশগুল, তখন তিনি হঠাৎ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন- “বিদ্যাসাগরই তো আরও একবার প্রমান দিয়ে দিল, যতই যাই হোক বাঙালির জাত্যাভিমানে আঘাত লাগলে আবার সবাই রাস্তায় নেমে আসবে প্রতিবাদে।” হঠাৎ করে যেন তারই এক টুকরো দেখলাম ১৪ই মে’র ফেসবুকে। বাংলার প্রতি বাঙালির প্রতি এই গর্ব জেগে থাকুক আমাদের মননে এক একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে। যাতে আঘাত নামলেই যেন গর্জে উঠতে পারি, যাতে আরেকবার নতুন করে সবাই মিলে গড়ে তুলতে পারি বাংলা ভাষার মূর্তিটাও।

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.