• Blogtog

জমিদার,প্রবল উদার,জেন্ডারিস্টঃ বিভিন্ন ধরনের বাঙালি প্রেমিক- সৌমিত দেব


সৌমিত দেব

চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের বেশ কিছু তুমুল লেখার মধ্যে একখানা ছিলো 'প্রেমিকা হইতে সাবধান'। মানে প্রেমিকা কেমন হলে তখুনি বাড়ির বাস ধরা উচিৎ। একলা। লেখায় উনি বেশ কয়েকটা 'ধরণ'-এর উল্লেখ করেছিলেন। এইটে তার কাউন্টার কখনই নয়। বরং কমপ্লিমেন্ট করবার একটা চেষ্টা বলা যেতে পারে। তাই শেষপাতে টালার জলে ট্যাঙ্কিপুজোর মতই কোট করে আমি সে চেষ্টায় সার্থকতা আনবার চেষ্টা করবো।


১) জমিদার

এ বিশ্বাস করে এতদিন ধরে যা চলে আসছে সেটাই সত্যি। এ ছেলে আপনাকে নিজের সম্পত্তি মনে করে। কনসেন্টকে সে ভাবে উইল। "হ্যাঁ"কে ভাবে সই। এবার আপনার ফোনে কতটা চার্জ থাকা উচিৎ সেটাও সে ডিসাইড করে দেবে। এমনিতেও রাত্রিবেলা তাকে গুডনাইট বলে দেওয়ার পর ফোনে চার্জ দিয়ে আপনি করবেনটাই বা কী? বাড়ি ফিরতে দেরী হলে সে লোকেশন পাঠাতে বলে। আপনার বাড়ির লোকের সাথে তার সম্পর্ক আপনার চাইতে ভালো। আপনার বাবা মায়ের সাথে বসে সে আপনার চুড়িদারের মাপ, কেরিয়ারের গতি নির্ণয় করে। আপনার সমস্ত বন্ধুর নম্বর তার মুখস্থ। আপনার প্রিয়তম বান্ধবীটিকে সে দু'চক্ষে দেখতে পারে না। আপনার অফিসের বেয়ারাটিও তাকে জামাইবাবু বলে ডাকে। পাড়ার দোকানে কফি খেতে গেলেও আপনার তার কাছে পারমিশন চাইতে হয়। আর চাইলেই সে নিজে কফি নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। এ ছেলেকে কেউ ছেলেবেলাতেই সহজপাঠের সাথে গিলিয়ে দিয়েছে মেয়েদের বুদ্ধি কম ও তারা কমজোরি। ফলে আপনি চান না চান, সে আপনার সলমন খান। বডি তো বালাইষাট, আপনার ডিসিশন অবদি গার্ড করে রাখে সে নিজের পৌরুষে। সকলের সামনে মুখঝামটাকে মনে করে অধিকার, অধিকারকে মনে করে প্রেম, প্রেমকে মনে করে দাম্পত্য, নাইন্টিন সিক্সটিজের। এদের সাথে ব্রেকাপ করা খুব শক্ত। বললাম না, বাড়ির লোকের সাথে সম্পর্ক ভালো।


২) প্রবলোদার

প্রবল উদার। এ রিক্সাতেও একপাশে ঘেঁষে থেকে আপনাকে স্পেস দেওয়ার চেষ্টা করে। আপনি বুঝে উঠতেই পারেন না এ ছেলে আপনার সাথে সম্পর্কে এলো ক্যানো? এর কিছুতেই কিছু যায় আসে না। বললেন -"কথা বলতে ইচ্ছে করছে না", এ ছেলে রিপ্লাইয়ে শুধু "ওক্কে" লিখে সিনেমা দেখতে বসে গ্যাছে। আপনার রাগ হলেই সরি বলে দেয়। ঝগড়া করতে গেলে চুপ করে থাকে। আপনি বন্ধুদের সাথে থাকলে ভুলেও মেসেজ করে না। টেকেন ফর গ্রান্টেড হওয়ার জন্যেই যেন জন্মেছে সে। আপনার বন্ধুদের মাঝে ডাকলে সে -"আরে আমি ওখানে গিয়ে কী করবো?" বলে। আপনার জ্বর হলে ওষুধ বলে দেয়। কিন্তু মাথার কাছে বসতে বললে বলে ইনফেকশন হতে পারে এই সময়ে। আপনার যে ছেলে বেস্টফ্রেন্ডটি কপালে "Hope" লিখে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাকে নিয়েও বাজে কথা বলে না। সেইবার যখন, কোনো পার্টি বা বন্ধুর বাড়িতে "আরে হয়ে যায়" মূলক গিলটিপনা করে এসে মাথা নিচু করে বলে দিলেন, তাতেও রিয়্যাকট না করায় আপনার নিজেকে কী ফ্যালনাটাই না মনে হলো! এ আবদারকে জোর করা ভাবে আর জোর করাকে অন্যায়। হাল ছেড়ে দিয়ে যেদিন ছেড়ে দিলেন সেদিন বলেছিলো "আচ্ছা। ভালো থাকিস।"


পড়ুনঃ


৩) উদার জমিদার

এ বিশ্বাস করে এতদিন ধরে যা চলে এসেছে তা সব ভুল। ফলে জেনরেলি আঁতেল হয়। পড়াশুনো থাকে। কিন্তু জমিদারের সব গুণাবলী এর মধ্যে বর্তমান। এ ছেলেও আপনাকে নিজের সম্পত্তি করে। কনসেন্টকে মনে করে ম্যাজিক রিয়্যালিজম। ম্যাজিক রিয়ালিজমকে মনে করে সত্য। ফলে কোনো এক মুচমুচে সন্ধ্যাবেলায় আপনাকে 'লাভ আজ কাল' ছেড়ে লাভ ডায়াজ দেখতে হয়। আপনার বাড়ির লোককে সে নিজের বাড়ির লোকের মতই মানুষ মনে করে না। আপনাকেও না। কনভেনশনাল সবতাতে তার আপত্তি। ঘরে থাকলে কঠিন বই পড়ায়। বাইরে চুমু খেতে চায়। আপনার সাথে সাথেই তার আরও একধিক সম্পর্ক আছে জানতে পেরে যদি আপনি রিয়্যাক্ট করেন তাহলে সে আপনাকেই অশিক্ষিত বলে। তার অ্যাকোয়াটাইকোটিসের সাথে থিওরি ওফ রিলেটিভিটির থিওরি পড়ে আপনিও প্রথম প্রথম এ সমস্ত কিছুকে, ট্যান্ট্রাম অফ ট্যালেন্ট মনে করতেন। কিন্তু আপনি কারোর কাঁধে মাথা রাখলেও নেশা করে টাইপো সমৃদ্ধ "sali beesssua *besya" লিখে পাঠানোয় সে ভুল আপনার ভাঙ্গে বটে। পরদিন সকালে সর‍্যি বলে অবশ্য। কিন্তু ততক্ষণে আপনি ব্রেকাপের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এদের সাথে ব্রেকাপ করতে হলে খুব কঠিন হৃদয় হতে হয়। কারণ এরা দিনে চারবার নিজেকে শেষ করে ফেলবার হুমকি দেয়। ব্রেকাপের পর।


৪) জেন্ডারিস্ট

এ ছেলে জীবনে কোনোদিন রাস্তা পার করবার সময় আপনার হাত ধরেনি। বাড়ি এগিয়ে দেয়নি। দরজা খুলে দেয়নি। ধরুন আপনি চাইছেন সে এমনিই যাক আপনার বাড়ি অব্দি, আরেকটু এক সাথে থাকা যেতো তাহলে। কিন্তু তাতে সে আপনাকে নিজের বাড়িতে অব্দি যেতে বলবে। এ ছেলে "আমি ছেলেমেয়ের মাঝে কোনো ফারাক করি না" এটা পদে পদে বুঝিয়ে দিতে দিতেই আপনাকে সবচাইতে বেশি মনে করাবে আপনি মেয়ে। মেট্রোতে উঠে নিজে বসে পড়ে। বাড়ি পৌঁছলেন কিনা জানতে চায় না। কেউ বিরক্ত করলে নিজেকেই সামলে নিতে বলে। অ্যানিভার্সারিতেও বিল স্প্লিট করে নিতে চায়। সেবার আপনি ভালোবেসে রান্না করে খাওয়াতে চাওয়ায়ও না করেছে। মদ কিনে এনে দিতে বললে সেকেন্ড ওয়েভ ঝেড়েছে। ইচ্ছে না থাকলেও আজকাল আপনাকে সিগারেট খেতে হচ্ছিলো। এ প্রেমটাকে সোশিওলজির চ্যাপ্টার মনে করে ও আদরের সব ওলেবাবালের ভেতর শোভিনিজম খুঁজে বেড়ায়। এই সেইদিন আড়াইটে নাগাদ, রাস্তার পাশে অত্তগুলো মাতাল দাঁড়িয়ে আছে দেখে শুধু ট্যাক্সি অবদি এগিয়ে দিতে বলায় ক্যামন ব্যাঁকা হেসে "আসলে পেট্রিয়ার্কি মেয়েদের ভেতরও বর্তমান"- বলেছিলো মনে আছে?


৫) জো জিয়া ওহি সিকান্দার

এ জানে পৃথিবীর সব ছেলে আসলে আপনাকে যৌনতাযন্ত্র ছাড়া আর অন্য কিচ্ছু মনে করে না। আর তাই একমাত্র আপনার বাবা ছাড়া আপনার পরিচিত বাকি আর সকল পুরুষের চোখ দেখেই সে তাদের বদ অভিসন্ধি আঁচ করে নেয়। সম্পর্কে থাকাকালীন যে বাক্যটি আপনি তার কাছে সবচাইতে বেশি শুনেছেন, তা হলো "কে কে যাচ্ছে?...এত গুলো ছেলে?" সে চায় সে বাদে আপনার চারপাশে যেন আর কোনো ছেলে না থাকে। এ নিজেকে ভাবে কাউন্সিলর, আপনাকে ভাবে ওয়ার্ড, আর পৃথিবীর বাকি সমস্ত পুরুষকে বিরোধী দলের নেতা। ফলে রাস্তায় বালি ফেললেও রাতবিরেতে অ্যাটেস্টেড করতে হয়ই। তাই এ বেশি হম্বিতম্বি না করে ঘ্যানঘ্যানে মন দেয়। এ জানে সকালে আপনার ক' আউন্স পটি হয়েছিলো। আপনার মনখারাপ না হলেও, হয়েছে আন্দাজ করে, আপনাকে কিছু একটা কারণ বলতে বাধ্য করে। আপনার এবং বিরোধী দলের কাউকেই পাড়ার আশেপাশে আসতে দেয় না। আপানার সব ছবিতে কমেন্ট করে টেরিটরি মার্ক করে। আপনার সব পোস্টে লাভ দিয়ে প্রেম চিল্লায়। আপনি তার কাছে ট্রফি। ট্রফি হারাতে সে নারাজ। যেদিন বলেছিলেন এভাবে আর চলছে না, সেদিন বলেছিলো -"কে? রাহুল তো? নাকি ওই লম্বা ছেলেটা যার বাইক আছে?"


৬) বোবা কোকিল

এ ছেলে আপনাকে অন্তর্যামী ভেবে বসে আছে। এর রাগ হলে, কথা বলতে ইচ্ছে হলে, খিদে পেলে, হাগু পেলে, কোনো কিছুই আপনাকে বলবে না। আপনাকে বুঝে নিতে হবে। কোটিচারেক বার জিজ্ঞসা করার পর বচ্চনিয় ভঙ্গিতে "কিছু না বললাম তো" ছাড়া আর কিচ্ছু আপনি বের করতে পারবেন না। এ স্বপ্ন দেখে বান্ধবী মহলে আপনি "ও তো রাগ হলে কিছু বলবেও না, খালি চুপ করে যাবে" বলছেন। এ রাগ না দেখানোকে উদারতা ভাবে আর নিজেকে মহান। সহ্য করতে করতে গুম মেরে যাওয়াকে আইডিয়ালাইজ করে। চিলি চিকেনের জায়গায়, স্পাইসি চিলিচিকেন অর্ডার করবার সময় সে কিছু বলেনি। তার তাই নিয়ে আগামী দু'হপ্তাও কিছু বলেনি। কোনো কথা না। এর সাথে ব্রেকাপ করা খুব সহজ। কারণ যদ্দিনে এ ভেন্ট আউট করবে তদ্দিনে আপনি সুখে সংসার করছেন।


এ ছাড়াও আরও কিছু আছে: ফরেস্ট গাম্প (বুঝতেই পারে না কী করা উচিৎ), গরীবের ব্র‍্যাডপিট (যে মনে করে হাজার মেয়ে পাগল হওয়া সত্ত্বেও আপনাকে হ্যাঁ বলে সে আপনাকে ধন্য করে দিয়েছে), ব্রো (এ জানে না প্রেমিকা আর বন্ধুর একটা ফারাক আছে), ডোনাল্ডট্রাম্প (এ মনে করে উপহার ক্যানসার সারিয়ে দিতে পারে), আরও কত্ত। দিনে দিনে আরও বাড়বে। অনেক পুরুষ নিশ্চয়ই ওপরের বিবরণগুলো থেকে অনেক নারীকে ছবির মত দেখতে পাচ্ছেন।

"অসম্ভব নয়। ঘটি আর বাঙাল পাশাপাশি থাকতে থাকতে কত জায়গায় মিলেজুলে গেল!"


পড়ুনঃ




0 views
  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.