• Blogtog

কুয়াশায় ভেজা বন পথে, প্রেমিকা বলতে কেবল নির্জনতা | চুম্বন তো আগেই রাঙিয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে


ঋদ্ধিমান


মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা, তাই ঠিক পুজোর আগেই তিতলি এল। মেঘ-বৃষ্টির ঘ্যানঘ্যানানি সঙ্গে নিয়ে যখন শিয়ালদা থেকে ট্রেনে চাপলাম,তখন বাইরে জোলো বাতাস মাখা ধারাপাত আর পুজো-পুজো আমেজ। মালদা অবধি বৃষ্টির গায়ে পড়া আদিখ্যেতা চলতেই থাকল। এরপর থেকে বৃষ্টিটা ধরতে শুরু করেছিল। সকাল বেলায় দেখি রোদ ধরেছে। নিউ জলপাইগুড়ি পেরিয়ে ট্রেন ছুটে চলল সুকনা ফরেস্টের ভিতর দিয়ে। বনের ভেতর রেলের আওয়াজে উঁকি দিয়েই লুকিয়ে পড়ে ময়ূর। তিস্তার সবুজে রোদ উপচানো স্নিগ্ধতা চোখে ভরে সাড়ে নটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম নিউ মাল জংশন। এরপর কেবল উত্তরবঙ্গের উজাড় করা সৌন্দর্য্য, রাস্তার দুপাশে। গরুবাথানের চা বাগান পেরিয়ে,কাশ ওড়ানো চেল নদীর ব্রিজ টপকে যত এগিয়েছি রোদ্দুর ততই কমেছে মেঘ আর কুয়াশার দাপটে। পাইন,বার্চ আর ফারের বনে সবুজের বাড়াবাড়ি আর উত্তুরে হাওয়ার সওগত নিয়ে যখন লাভাতে এলাম,ঘড়িতে দুপুর হলেও আকাশের মুখে কুয়াশার ঘোমটায় যেন সন্ধ্যে নেমেছে। হোটেল পার্কার থেকে দেখি লাভার লাল রঙা মোনাস্ট্রি পাইন বনের পাশে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে। 



সন্ধ্যের মোমো আর রাতের চিকেন কারির জন্য পেট গরম না হলেও,পূর্ব পরিকল্পনা মতন ভোর না হতেই বেরিয়ে পড়লাম। অন্ধকার চারপাশ। কিন্তু আকাশে মেঘ মুক্তির উস্কানি আছে। মোনাস্ট্রির গেটে হত্যে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাড়ে পাঁচটায় গেট খুলতে ভেতরে এলাম। চড়াই পথের ধারে বড় বড় ফার্নের পাতা,রাতের কুয়াশা আর শিশিরে ভিজে আছে চুপচুপে হয়ে। কত না রঙীন ফুল ধরছে।বাঁদিকের রেলিংয়ের ওপারে খাদ ছড়িয়ে পড়েছে উপত্যকা বরাবর বহুদূরে। ন্যাওরা ভ্যালির সহজাত সৌন্দর্য উপত্যকার বনভূমিতে। গমগমে ড্রামের আওয়াজ আসছে প্রেয়ার রুম থেকে। 









পায়ে পায়ে এগোচ্ছি,চোখ আকাশের ক্যানভাসে আটকানো। পাও আটকে গেল। কে যেন গেয়ে উঠল দেখরে নয়ন মেলে জগতের বাহার। তাকিয়ে দেখি ভোরের আলোয় কাটে অন্ধকার। এক চিলতে আগুন যেন আকাশের সীমানায়। ক্রমশ প্রকাশিত হলেন কাঞ্চনজঙ্ঘা—সোনায় মোড়া। নবকুমার নাই বা হলেম,যা দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না! এ যেন এক অপার্থিব প্রাপ্তি। বিকশিত,উদ্ভাসিত কাঞ্চনজঙ্ঘার সামনে সময়ের মৃত্যু অনিবার্য, অনিবার্য হিপনোটাইজড হয়ে পড়া। পর পর সূচী মেনে লোলেগাঁও,ঋষিখোলা, গুম্ফাদারা, কোলাখাম চষে বেড়িয়েছি। অজস্র মন মাতানো মুহূর্ত লেন্স বন্দী করেছি। 


পড়ুনঃ প্রায় একশ বছর পুরনো কলকাতার কিছু বিখ্যাত খাবারের দোকান এখনো রমরমিয়ে চলছে


ছাঙ্গে ফলসের জন্য নেমেছি অনেকটা নীচে। তবু মন পড়েছিল রিশপের জন্য। যে পিছুটান কাঞ্চনজঙ্ঘা রেখে গেল লাভাতে,তার নিষ্পত্তি চাই।গাড়ি তৈরি ছিল হোটেলের সামনে। কিন্তু আমরা অপ্রস্তুত! কিছুতেই গাড়িতে যাবো না। বাকিরা ম্যাগি খেয়ে রওনা দিল আর আমরাও গান গাইলাম—যেতে দাও গেল যারা। দশ কিলোমিটারের ওই বোল্ডার ফেলা রাস্তায় যন্ত্র চালিত শকটে আমরা যাবো না। আমরা তিনজন অযান্ত্রিক ১১ নম্বরের ভরসায় রওনা দিলাম। গাঢ়োয়ালে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা বলছে,ধারে ভারে লাভা থেকে রিশপের ছয় কিলোমিটারের হাঁটা পথে ট্রেকিং বেশ নিরিহ। তবুও দাপুটে সবুজের সখ্যতা পাবো সেই আশা নিয়ে ন্যাওরা ভ্যালির বনপথ ধরে চললেম রিশপের দিকে। লাভার মলে দেখি নবরাত্রির শোভাযাত্রা চলেছে। সেই মিছিল পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম ফরেস্ট বাংলোর চত্বরে। বার্চ,পাইন আর ফারের ছায়ায় মোড়া কটেজকে ডান দিকে রেখে খাঁড়া চড়াই বেয়ে এগিয়ে চলতে দেখি পথ ভাগ হয়েছে দুভাগে। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে উঠে গেছে আর একটা পথ। স্থানীয় এক মহিলার কথায় জানলাম,ওই পথও গেছে রিশপের দিকে—শর্টকাট!চল তবে অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যাক। ভাঙাচোরা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা উঠে এসে দেখি মূল রাস্তা অনেক নীচে। রোদ ততক্ষনে আড়ালে।  চাপ চাপ কুয়াশা নেমে আসছে মাথার ওপর। বনের পথে কেবল একটানা ঝিঁঝির ডাক। কতনা ফুলের গুলশন পথের দুপাশে। আকাশ ছেয়ে সব আদিম মহাদ্রুম। সব গাছে পুরু কার্পেটের মতন বিছিয়ে আছে মসের কার্পেট। ইতিউতি পাখি ডাকছে,উড়ছে রঙীন প্রজাপতি। সত্যি মনে হচ্ছিল আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। ক্রমাগত শর্টকাট আর পাকদন্ডী ধরে এগোতে এগোতে ঠিক পৌঁছে গেলাম রিশপ।





টিবেট হোমস্টের সামনে দেখি দলের বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে। আমার সাড়ে তিন বছরের কন্যাটিও ছুট্টে এল আমায় দেখে। হোমস্টের সামনে ফুলের বাগানেও রোদ চিকমিকিয়ে উঠল। দুপুরের খাওয়া দাওয়া একেবারে ষোলআনা বাঙালী। ইয়া বড় কাতলার পেটি হজম করে অন্যত্র হলে দিবানিদ্রা অবহেলা করা সহজ হতো না। এখানে এসে তা অপরাধ হত। তিব্বতি ভাষায় রি শব্দের অর্থ পাহাড় আর শপ মানে উঁচু গাছ। সেই উঁচু-উঁচু গাছে মোড়া পাহাড়ি এই হ্যামলেট এতটুকু অবকাশ দেয় না ঘর বন্দি থাকতে। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম ভিউ পয়েন্টে। বেলা গড়িয়েছে,আকাশ আবার মেঘলা তবু নীচের উপত্যকা ঢালে মেঘ আর সবুজের বৈপরিত্য দেখতে দেখতে মনে মনে হারিয়ে যাই রূপকথার মতন কোন এক রাজ্যে। সেখানেই আচমকা আলাপ হল একজন প্রফেশনাল বার্ড ওয়াচারের সাথে। উনিই জানালেন কমবেশী প্রায় তিরিশ প্রজাতির পাখি আছে এই তল্লাটে। ছবি তুলছেন নিজের ব্লগের জন্য। ওনার গল্প শুনে আমাদেরও সেলিম আলি হতে ইচ্ছে হল। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা হয়েছে,আপাতত তিনি অবগুন্ঠিত। তাই কিছু পাখির সন্ধান পেলে মন্দ হয় না,এই ভেবেই চষে ফেললাম বন-বাদাড়। 


ওনার কথা মত দুর্গম পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চলে গেলাম বনের গভীরে। অভিযান ব্যর্থ হয়নি একেবারেই। তিরিশটি না পেলেও সান বার্ড, ওয়াগ টেইল, ইউরেশীয়ান স্প্যারো, গোন্ডেন ফ্রন্টেড লিফ বার্ড, ব্লু ক্যাপড রক থ্রাস, হিমালয়ান ডাভ,গ্রিন ব্যাক টিট আর কিছু ফিঙের সন্ধান পেলাম। ছটফটে পাখি গুলোর ছবি ক্যামেরার বন্দি করতে পারায় পুলকিত হলাম,নিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়ালাম। রিশপে রাত হয় ভীষণ মায়াময় হয়ে। আলো জ্বলে হোম স্টে গুলোতে। দূর থেকে চোখে পড়ে কোলাখাম আর লাভার আলো। আকাশ জুড়ে তারার আলপনা। কনকনে ঠান্ডায় কম্বলের তলায় মেয়ের সাথে খুনসুটি করতে করতে দেখি বারান্দায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দুই নাইট ওয়াচ ম্যান। একটি ভুটিয়া আর অন্যটি তিন মাসের চনমনে জার্মান শেপার্ড। ভোর হতেই ভেবেছিলাম আর একবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে আসি,সেই মত চলে এলাম। মেঘ ছিল,ততটা স্পষ্ট হল না পাহাড়ের চুড়ো। আবার গ্রামের ভিতর দিয়ে চলে এলাম রিশপের একমাত্র বৌদ্ধ মন্দিরের মাঠে। ঠিক তখনই পুবের আকাশে টুকি দিলেন সূর্য্যদেব। আস্তে আস্তে রোদের সোনা ছড়িয়ে গেল মেঘে মেঘে। 


এরপর ফিরে যাওয়ার পালা। রিশপের প্রকৃতিময়তা ছেড়ে আবার কালিম্পঙ হয়ে ফিরে চলা শহরের ক্যাকাফোনিতে। রোজকার দিনগত পাপক্ষয়ের এপিলগ হয়ে মনের খাতায় রয়ে গেল রিশপ— কৈশোরের চপলতা ভরা প্রেমের মতন।  Photography: Riddhiman Bhattacharyya, Sayak Ghosh, Dibyojit Chakraborty



  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.