• Blogtog

মশিয়ে টিনটিন যখন কলকাতায় । ঋদ্ধিমান ভট্টাচার্য্য

ঋদ্ধিমান ভট্টাচার্য্য

১। কলিং ফ্রম বেলজিয়াম

ল্যান্ডফোনে রিঙ বাজতেই সন্তুর আগে উঠে গেল জোজো। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় কাকাবাবুর সাথে একবার দেখা করে যায় জোজো। এমনিতে কাকাবাবু আর বিশেষ বাইরে যান না। অনেকটা সিধু জ্যাঠা,মানে সিদ্ধেশ্বর দত্তের মতন হয়ে গেছেন। নানা প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকারী - বেসরকারী দপ্তর থেকে লোকেরা আসেন। যেসব খবর গুগুল রাখেনা,তা থাকে কাকাবাবুর কাছে। জোজোর গুল দেওয়ার অভ্যেসটা রয়ে গেলেও,ততটা নেই। ইতিমধ্যে একদিন ঘনাদা এসেছিলেন, কাকাবাবুর কাছে। তখন জোজোও ছিল,মুখ খুলতে চেয়েছিল,কিন্তু ডোনাল্ড ট্র্যাম্প যে মেক্সিকো সীমান্ত বরাবর পাঁচিল টানার পরিকল্পনা ঘনাদার সাথে ডিসকাস করেই বন্ধ রেখেছে সেই শুনে সমঝে গেছে। সেই থেকে গুল বাজির গুলশন নেই। ফোনটা ধরে রীতিমত  সাহেবি অ্যাকসেন্টে কথা শুরু করল জোজো।


—রজত ভট্টাচারিয়া হিয়ার।

—হি ইজ মাই আঙ্কেল। ইউ মে টেল মি। আই উইল কমিউনিকেট।

—আই নো ব্রাসেলস। আই ওয়াজ দেয়ার সেভারেল টাইম।

—হু ওয়ান্টস টু টক?

—টি---টি----


ওপারের কথা শুনতে না পেলেও, জোজো ফোনে টিটি পাখীর মতন ডাকতে থাকায়,সন্তু উঠে এসে ফোনটা নিল। তারপর প্রায় মিনিট পাঁচেক কথা বলে ফোনটা রেখে দিয়ে জোজোর দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল।


—একদম হাসবি না বলছি, সন্তু। আমি জানি তুই যে ভাষায় কথা বললি সেটা ফ্রেঞ্চ। বহুদিনের অনভ্যাসে বলতে পারি না,কিন্তু বুঝতে ঠিক পারি।

—কি বুঝলি বল?

—বুঝলাম মশিঁয়ে ত্যঁতাঁ আসবেন কাকাবাবুর সাথে দেখা করতে।

—ঠিক। পরশু শনিবার দুপুরে কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ব্রাসেলস থেকে কোলকাতা আসছেন সকুট্টুস টিনটিন। বিশেষ দরকার। তাই তুই আর আমি যাব ওনাকে রিসিভ করে নিয়ে আসতে।

—কাকাবাবু জানেন?

—কাকাবাবু বন্ধু ইয়ংমার স্মেল্টের সাথে টিনটিনের কথা হয়েছে। স্মেল্ট কাকাবাবুকে ই-মেল করে জানিয়েছিলেন। কাকাবাবুও রাজি । সেটা টিনটিনকে জানাতে ও কোলকাতায় আসার ডেট ফিক্সড করেছে।

—এই স্মেল্ট ভদ্রলোক কে রে? মনে পড়ছে না।

—আরে সেই সুইডিস বিজ্ঞানী যিনি অনেকদিন নিরুদ্দেশ ছিলেন। তারপর সুন্দরবনের খাঁড়িতে পরিতক্ত্য এক লঞ্চ থেকে উদ্ধার করা হল। তুইও ছিলি তো!

—ও, মনে পড়েছে। সেই রবীন্দ্রনাথের মতন দাঁড়ি। ভদ্রলোক এখনো বেঁচে আছেন?

—হ্যাঁ। বহাল তবিয়তে। অনেক বয়েস হয়ছে। প্রায় একশোর কাছাকাছি।

—টিনটিন কেন?

—সেটা বলল না। বলল কোলকাতা আর সাবার্নের দুগ্গা পুজো দেখবে। সুযোগ পেলে নবদ্বীপ, বহরমপুরও যাবে। টাকীর বিসর্জন দেখবে। সুন্দরবনেও যেতে পারে। তবে আসল উদ্দেশ্য খোলসা করল না।

—আমারা সাথে ভিড়ে যেতে পারি তো?

—পারি। তবে আগে কাকাবাবুর থেকে পারমিশন নিতে হবে।কথা শুনে মনে হল,কাকাবাবু জানেন আসল ব্যাপারটা।

২। বেঙ্গলী ডেলিকেসি

ঘুম থেকে উঠেই জোজোকে ফোনে ট্রাই করল সন্তু। দশটার মধ্যে এয়ারপোর্ট পৌঁছে যেতে হবে। যতদিন টিনটিন থাকবে ওর সাথে ছায়ার মতন লেগে থাকতে বলেছেন কাকাবাবু। অফিস থেকে ছুটিও অ্যাপ্রুভড হয়ে গেছে। জোজোর ফোন সেই ১৫ মিনিট ধরে এনগেজড। ধুত্তোর বলে ফোনটা রেখে দিল সন্তু। ড্রয়িংরুমে এসে বসল। কাকাবাবু সবে মর্নিংওয়াক সেরে ফিরেছেন,এখনো জগিং শু খোলেননি। খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন। সন্তুকে দেখে কাগজ রেখে গুডমর্নিং বললেন।


—আজ কিন্তু টাইমলি পৌঁছে যেও। টিনটিনকে নিয়ে ডাইরেক্ট  এখানে আসবে। তবে আসার পথে ওর জন্য সুইসওটেলে রুম বুক করা আছে,সেখানে ওর লাগেজ নামিয়ে রেখে আসতে পারো। তবে  ওকে বলা আছে দুপুরের লাঞ্চ টিনটিন আমাদের বাড়িতেই করবে।

—তবে কি দুপুরে বেলজিয়ান ডেলিকেসি!

—এক্কেবারে নয়। অতিথিদের জন্য সবসময় সেই জায়গার ট্রাডিশানাল ফুড অফার করতে হয়। এটাই ঐতিহ্য। আমি বাজার করে এনেছি। তোমার মা রাঁধছেন। সুক্তো,মুগের ডাল,বেগুন ভাজা,ইঁচোড় চিংড়ি,ছানার কোপ্তা,কাতলার কালিয়া,ইলিশের পাতুরী,পাঁঠার মাংস, আমের চাটনী। দেবলীনাও দুপুরে আসছে। ও আসার সময় ভালো মিস্টি দই আর রসগোল্লা নিয়ে আসবে। রসগোল্লার কথা শেষ হতে না হতেই জোজো হাজির।

—সরি ভাই। তোর ফোনটা ওয়েটিংয়ে ছিল। আজকে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর ম্যাচ আছে। জুভেন্তাস আর রিয়েল। নিজের পুরোনো ক্লাবের সাথে খেলা তাই টেনশন করছিল। এতক্ষন ওর সাথেই কথা বলছিলাম। তোদের ফ্ল্যাটের সামনের পার্কটাতেই ছিলাম। পরে তোকে রিঙ করছি। তুই ফোন ধরলি না দেখে চলে এলাম।

—আবার শুরু করেছিস গুল দেওয়া।

—একদম না। রোনাল্ডো আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। টিনটিন আসুক, ওকেও ফ্রেন্ড করে নেব আর তার সাথে ওকে বলে লুকাকুর সাথেও কনটাক্ট করে নেব। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল জোজো,কাকাবাবু বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই থেমে গেল।

—তোমরা দেরি কোরোনা। ব্রেকফাস্ট করেই রওনা হয়ে যাও। আমি এয়ারলাইন্সে কথা বলেছি,ফ্লাইট একদম শিডিউলড টাইমে ল্যান্ড করবে। আর টিনটিনকে চিনতে পারবে তো? জোজোই আগে রিঅ্যাক্ট করে।

—কি যে বলেন কাকাবাবু। সেই ছেলেবেলা থেকে পড়ছি। ওই হেয়ার স্টাইল। ভুল হওয়ার কোন চান্সই নেই।

—তোমার বুদ্ধিটা এখনো কাঁচাই রয়ে গেল, জোজো। তোমরা যে টিনটিন কে তোমরা হার্জের বইতে দেখেছো তার বয়স আর আজকের টিনটিনের বয়সে কত তফাৎ জানো? হি ইজ এইট্টি নাও। মাথায় একটাও চুল নেই আর। তবে স্ট্যামিনা আর জেনারেল হেলথ দুটোই সাংঘাতিক। সামনে পরোটা আর আলু চচ্চড়ি এসে পড়তেই জোজোর মগজের কুয়াশা কাটতে শুরু করে।

—কিন্তু কুট্টুস থাকবে বলেছে। ওকে দেখে ঠিক চিনতে পারব।

—বুদ্ধিটা একটু খুলেছে,তবে পুরোটা না।

—কেন কাকাবাবু জোজো তো ঠিকই বলল। কাকাবাবু সন্তুর দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

—এট টু ব্রুটাস! তুমিও। আরে কুট্টুস মানে একটা ফক্স টেরিয়ার প্রজাতির কুকুর এতদিন বাঁচে না। কুট্টুস মারা গেলেও টিনটিন আবার কুকুর পুষছে। তার নামও স্নোয়ি। কিন্তু সে কোন ব্রিড সেটা আমাকে বলেননি মিঃ স্মেল্ট। যা হোক পরোটার সদগতি করেই রওনা হয়ে যাও। কাজী নজরুল অ্যাভিনিউ জ্যাম থাকে।



৩। ডেস্টিনেশন এয়ারপোর্ট

জলখাবার পর্ব মিটিয়েই ক্যাব বুক করে ফেলেছে সন্তু। ক্যাবে উঠেই জোজোর প্রথম প্রশ্ন ছিল দুপুরের মেনু কি। ইলিশের নাম শুনতেই জোজো কেমন উদাস হয়ে যায়। তাই গোটা রাস্তা বিশেষ বকবক করেনি। দেবলীনা ফোন করে জানাল একটার মধ্যে চলে আসবে। এয়ারপোর্টে এসেই ওয়েটিং লাউঞ্জে এসে বসল সন্তুরা। ঠিক সময়েই প্লেন ল্যান্ড করল। সুনন্দ রায় চৌধুরী লেখা প্ল্যাকার্ড   হাতে সন্তুকে দেখেই টিনটিন এগিয়ে এলেন ওদের দিকে। করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। টিনটিনকে নিয়ে সন্তুরা রওনা দিল বাড়ির দিকে। লাগেজ তেমন কিছুই নেই। খালি দুখানা বড় সাইজের ব্যাকপ্যাক। গাড়িতে উঠেই টিনটিন দুজনকেই দুটো বেলজিয়াম চকলেট দিয়েছেন। ড্রাইভারের পাশে সন্তু আর সন্তুর কোলে নতুন স্নোয়ি। সে দিব্যি জানলা দিয়ে মুখ বের করে কোলকাতা দেখতে দেখতে চলেছে আর জোজো প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ করে তুলছে টিনটিন কে। কেন বেলজিয়ামকে ইউরোপের ককপিট  বলে? বেলজিয়াম দের কেন রেড ডেভিলস বলে? নীল রঙের বেল ফুল ওখানে কোন সময় ফোটে?হ্যাডক,ক্যালকুলাসরা কেমন আছে? আরো কত কি। আর টিনটিনও উত্তর দিয়ে চলেছেন। ভাঙা ভাঙা বাঙলা আর ইংরাজী মিশিয়ে দিব্বি গল্প করে চলেছেন টিনটিন। হঠাৎ  একটা মিস্টির দোকান দেখে গাড়ী থামাতে বলল। অনেক বলেও ক্যাবে ওঠাতে রাজি করানো যাইনি টিনটিনকে। হলদে ট্যাক্সিতে না চড়লে কোলকাতা আসা কেন? সেই ট্যাক্সিকে ওয়েটিংয়ে রেখে সন্তু আর জোজোকে নিয়ে মিস্টির দোকানে ঢুকলেন । ড্রাইভার কেউ ডেকে নিলেন আর সবাই কে পছন্দের জিলাপি আর সিঙাড়া খাইয়ে এক ভাঁড় রসগোল্লা নিয়ে আবার চললেন। গাড়ি চলতে শুরু করতেই টিনটিন গুনগুন করে গান ধরলেন।


—ও আমি কোলকাতার রসগোল্লা। ভাঙা বাঙলায় ওমন একটা গান শুনে হেসেই অস্থির সবাই। তারপর বাকি পথটুকু গান না গাইলেও কোলকাতার মিস্টি,কোলকাতার ফুটবল,ট্রাম

—এসব নিয়ে খুঁটিনাটি জেনে নিলেন বৃদ্ধ টিনটিন।


৪। মঁশিয়ের অভ্যর্থনা

বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন কাকাবাবু। টিনটিন আসতেই এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বললেন


— বিয়েভনিউ। প্রত্যুত্তরে টিনটিন কাকা বাবুকে বললেন

— নমস্কার মিঃ রায় চৌধুরী।

—বাঃ!আপনি তো দারুন বাঙলা বলেন।

—মিঃ রায় চৌধুরী,আমাদের ফ্রেঞ্চের মতন বাঙলাও মিস্টি একটা ভাষা। তাছাড়া সারা পৃথিবীর কমবেশী ১৪৩টি ভাষা আমি শিখেছি। আর তাও তো এক বাঙালী বন্ধুর কাছে।

—দারুন। কে তিনি?

—আপনিও চিনবেন। আমি ওকে তিলু বলে ডাকতাম। প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু। উনিই তো লিঙ্গুয়াগ্রাফ যন্ত্র দিয়ে নানান ভাষা শিখিয়েছেন।

—উনি নমস্য। আমপার বন্ধু স্মেল্ট বা ক্যালকুলাসের মতনই প্রতিভাবান।

—এই যে আন্ডিজে গেলাম, মরুভূমিতে আটকে পড়লাম সবতেই সাথে ছিল ওনার বানানো ইন্ডিকা বড়ি। সির্ফ এক ইন্ডিকা,ক্ষিধে গন। ঘরময় সবাই হেসে উঠলা হো হো করে। ঠান্ডা  ঘোলের শরবত এক চুমুকে শেষ করে টিনটিন চলে গেলেন কাকাবাবুর ঘরে। আবার দেখা হল,দুপুরে খাওয়ার টেবিলে। খাওয়ার বহর দেখে টিনটিন যারপরনাই আপ্লুত। কুট্টুসও দিব্যি একটা চেয়ারে চিকেন নিয়ে হাড় চিবাতে ব্যস্ত। ইলিশ মাছের কাঁটায় বিব্রত বোধ করলেও সব কটা পদই বেশ তৃপ্তি নিয়েই খেলেন টিনটিন। এদিকে সন্তুদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম। কাকাবাবুই নিরবতা ভাঙলেন।

—সন্তু,কাল মহালয়া। মহালয়ার পৌরানিক ব্যাপারটা আমি টিনটিনকে বুঝিয়ে দিয়েছি। তার সঙ্গে এই দূর্গা পুজোর মাহাত্ম্যও। এই পুজো বাঙালীর কাছে ঠিক কি তা টিনটিন ঘুরে দেখবেন তোমাদের সাথে। কোন রহস্য নয়। বাঙালীর আবেগ আর হুজুগটাই ওনাকে দেখাতে হবে। কাল থেকেই শুরু। একটা চক আউট করে নাও,কোথায় কোথায় যাবে।

—কাকাবাবু আমার মতে,কাল সকালে বাবুঘাটের তর্পণ দিয়ে শুরু হোক টিনটিনের পুজো পরিক্রমা। এরপর কুমোরটুলি থাক। তারপর নিউমার্কেট,গড়িয়াহাটে শপিং ম্যানিয়াকদের দেখাবো। কলেজস্ট্রিটও থাকবে। পুজোর সময় কিছু বাছাই করা প্যান্ডেল আর কয়েকটা রাজবাড়ির পুজো ঘুরে দেখবো। নবমীতে যাব টাকী। দমশীর দিন দুই বাঙলার সীমান্তে বিসর্জন দেখে ফিরে আসবো কোলকাতা।



৫। মহালয়ায় বাবুঘাট

জোজো আর সন্তুর সাথে শুরু হল টিনটিনের পুজো পরিক্রমা। সেই ভোর বেলায় আকাশবাণীতে বীরেন্দ্র ভদ্রের চন্ডীপাঠ শুনে সকুট্টুস টিনটিন আর সন্তুরা হাজির হয়ে গেল বাবুঘাটে। দেবলীনাও সেজেগুজে হাজির। বাবুঘাট পেরিয়ে গঙ্গাসাগর সম্মেলন ময়দানের প্রাতঃকৃতের গন্ধে বিভোর হয়ে জজেস ঘাটে আসতেই বুড়ো টিনটিন কেমন ভেবড়ে গেছে। রাস্তার ওপারে লোটা হাতে বাহ্যরত আর গঙ্গাপাড়ে তর্পণরত গদগদ বাঙালীর হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে মন্ত্রপাঠ আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ফোর্ট উইলিয়ামের সেনাদের ব্যাগপাইপারের ভোঁ। কোনদিকে কনসেসট্রেট করবে বুঝে ওঠার আগেই দেখে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্যামেরাম্যান হাজির। বিব্রত টিনটিনকে আশ্বস্ত করতে হল ওরা কেউ পাপারাজি নয়। সঙ্গের ট্রলিহাতে ললনারা কেউ ডায়না নয়,তবুও হয়ত ওদের প্রাক বিবাহের আহ্লাদে প্রেমিক যুগলের নানাবিধ ভঙ্গিমায় ছবি তোলার এটাই উপযুক্ত স্থান। জেমস প্রিন্সেপের সমাধি ক্ষেত্রে তাই প্রেমিক যুগলের ভীড় কখনো পাতলা হয় না। টিনটিন মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন। জোজোও ক্রমাগত সেলফি তুলে চলেছে। হঠাৎ খানকতক নেড়ি এসে কুট্টুসকে মোলেস্ট করার চেষ্টা করলে তড়িঘড়ি পালিয়ে আসতে হল। গল্প যা হওয়ার ট্যাক্সিতেই হল। ধর্মতলায় কে সি দাশে রাধাবল্লভী,ছোলার ডাল আর অমৃতি-রসগোল্লা যোগে জলখাবার সেরে রওনা দেওয়া গেল নিউমার্কেটের দিকে।


৬। নিউ মার্কেট - গড়িয়া হাট

জব্বর ব্রেকফাস্ট সেরে প্রথমেই সন্তুরা গেল নিউমার্কেট। কেনাকাটার হুজুগটা টিনটিন প্রতক্ষ্য করে নেবেন। এব্যাপারে দেবলীনাই গাইড। একদিকে ব্যাগ,একদিকে কসমেটিকস,জুতো-জামা-শাড়ীর বহর দেখে টিনটিন বেশ উৎসাহিত। দেবলীনাও বেশ সহজাত দক্ষতায় চতুর হকারের প্রলোভন এড়িয়ে টিনটিনকে পৌঁছে দিচ্ছিল সঠিক দোকানে। গুচ্ছের টি-শার্ট টিনটিন নিজেও কিনলেন,কিনেও দিলেন সব্বাইকে—পুজোর গিফ্ট। আবার দেখা হয়েগেল ফেলুদা আর জটায়ুর সাথেও। জটায়ু তাঁর নতুন উপন্যাস “মাঝেরহাটে ম্যাসাকার” লেখায় ব্যস্ত হলেও, হলদে রঙের জহর কোর্ট কিনতে চলে এসেছেন ফেলুদাকে নিয়ে। তোপসে নতুন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিজি বলে আসতে পারে নি। জোজোর সেলফোনে একই ফ্রেমে ফেলুদা আর টিনটিন সহ একটা ফাটাফাটি গ্রুফি তোলা হল। তখনই এক ভদ্রমহিলাকে দেখে জটায়ু উচ্চৈ:স্বরে  হাই বলে ডাক ছাড়লেন। হাইলি সাসপিসিয়াস চোখে তাঁর দিকে তাকাতেই দেখি স্বয়ং সত্যবতী। দু‘হাতে থরে থরে শাড়ীর প্যাকেট। অজিত আর ব্যোমকেশের হাতেও বেশ কিছু। টিনটিন তো বেজায় খুশী হলেন। সত্যবতীও নমস্কার  জানাল টিনটিন কে। লালমোহন বাবুই জোর করে সবাইকে নাহুমসে নিয়ে গেলেন। কেক আর কুকিস খেতে খেতে টিনটিন আর ব্যোমকেশ বেশ আড্ডা দিতে লাগলেন। ফেলুদাও টিপ্পনী  কাটছিলেন মাঝে মাঝে। ফেলুদার মুখে ব্যোমকেশের কীর্তি কলাপ শুনে টিনটিনও আপ্লুত হলেন। প্রদোষ বাবু ব্যচেলর মানুষ,কোন পিছুটান নেই। কিন্তু পুরোদস্তুর সংসারী হয়েও,ব্যোমকেশ যেভাবে তদন্ত করে পপুলার হয়েছেন তা টিনটিনের মনে শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দিল। সত্যবতীও বেশ মিশুকে,জটায়ুকে চিনলেও বাকিদের সাথে এই প্রথম আলাপেই জমিয়ে নিলেন।


—আচ্ছা ফেলুবাবু, আপনি তো বয়সকালে বেশ হ্যান্ডসামই ছিলেন। শুনেছি কলেজের মেয়েগুলো টুপ করে আপনার প্রেমে পড়ে যেত। তবুও আপনি এই অজিত ঠাকুরপোর মতন ব্যচেলর রয়ে গেলেন কেন?

—ঠিক করেছেন। নইলে আমার মতন ছেলে-মেয়ে-বৌমা-জামাই-নাতি-নাতনীর জন্য পুজোর বাজার করেই কাটাতে হত। এনজয়মেন্টটাই মাটি।


সবাই হেসে উঠলেও সত্যবতী একটু রেগেই গেল। দেবলীনা ব্যাপারটা ম্যানেজ করেও নিয়েছিল। যা হোক টিনটিনের ইনভিটিশনে সবাই মিলে রওনা দেওয়া হল গোলপার্কের দিকে। ততক্ষণে দুপুর হয়েছে,লাঞ্চের সময়ও হয়েছে। টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান ট্রাইবাল ফুডের সন্ধানে তাই সন্তুরা টিনটিনকে নিয়ে ফেলুদা-জটায়ু আর ব্যোমকেশদের নিয়ে চলে এল সান্টাস ফ্যানটাসিয়া। জটায়ুও বেশ সড়গড় সয়েছেন। দিব্যি অক্টোপাস আর স্কুইড খাচ্ছিলেন। সত্যবতীর পছন্দ ম্যাকারেল আর স্যামন। দেবলীনা অবশ্যি বাঁশপোড়া চিকেনেই সন্তুষ্ট। পুজোর আগে একস্ট্রা ওয়েট পুট অন করবে না। জোজো আর সন্তু ফেলুদা-ব্যোমকেশ-অজিত আর টিনটিনের সাথে ল্যাম্প,ক্র্যাব,লবস্টার সবই চেখে দেখলো। দারুন একটা লাঞ্চের পর জোজোর চোখ ঘুমে বুঁজে আসতে চাইলেও উপায় ছিল না। বাকিদের বিদায় দিয়ে,টিনটিনকে নিয়ে যাওয়া হল গড়িয়াহাট। দেবলীনার মতে ওটাই নিকি শপিং প্যারাডাইজ। গোলমাল বাঁধল দাম নিয়ে। পছন্দের একটা পাঞ্জাবী নিয়ে কিছুতেই দরদামে পেরে উঠছিল না দেবলীনা। দোকানী দু‘হাজার দাম হাঁকলেও দেবলীনা সাড়ে পাঁচশোর বেশী দেবে না। টিনটিনও বুঝে উঠতে পারছিল না কি করা উচিত। দোকানী পাঞ্জাবীও দেবে না,দোকান থেকে আসতেও দেবে না। সমানে লাস্ট দাম বলে বলে দাম কমাচ্ছে। ঠিক যেন পরপর কতগুলো ওভার বাউন্ডারির জন্য আস্কিং রেট কমছে। হঠাৎ  হাজির প্রজ্ঞাপারমিতা মানে মিতিন মাসি। উনিই শেষে পাঁচশে নব্বইতে রফা করালেন। তবে দামটা নিজেই দিলেন। ওটা নাকি টিনটিনকে ওনার উপহার। উপহার পেয়ে টিনটিন বেশ খুশীই হলেন। কেনাকাটার স্বরূপ দর্শণের পর প্যারাডাইস লস্ট হয়ে জোজোরা চলে এল ক্যাফে স্ট্রিংয়ে। তখন সেখানে আবার হৈহৈ ব্যাপার। ব্লগটগের শব্দকল্পদ্রুম চলছিল। নামটা শুনেই টিনটিন জানালো সুকুমারের ওই কবিতাটার ইংরেজী অনুবাদ পড়েছিলেন। কবিতা আর গানে জমজমাট সন্ধ্যে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে এল সব্বাই।



৭।  কুমোরটুলি আর থিমের ঠাকুর

রাতের ডিনার সেরে,টিনটিন ফিরে গেলেন হোটেলে। জোজোও দেবলীনাকে নামিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। পরেরদিন সকালেই যেতে হবে কুমোরটুলি, ঠাকুর তৈরি দেখতে। সকাল হতেই টিনটিন হাজির হয়ে গেলেন,সাথে এক ঠোঙা জিলিপি। বারান্দায় বসে কাকাবাবুর সাথে এক প্রস্থ আড্ডা দিয়ে টিনটিনকে নিয়ে সন্তুরা চলল কুমোরটুলি। সরু গলি। স্যাঁতস্যাঁতে। মায়ের মূর্তি গড়াতে চাই ভেবে শিল্পীরা কাজ শুরু করলেও এখন ভাদ্রশেষের নিম্নচাপে লেবড়ি চেবড়ি অবস্থা। যেখানে ইশ্বরের জন্মহয়,সেই খানে এসে টিনটিনের চোখ তো ছানাবড়া। লালিত্য আর স্নেহ উপচে উঠা মাতৃপ্রতিমা সব সার দিয়ে সাজানো। চলছে রঙ শুকানোর কাজ। টিনটিনের মনে খালি একটাই খটকা,এত সুন্দর সব শিল্প অথচ তার যাবতীয় চাকচিক্য কেবল সামনে। পিছনটা কোনরকমে দায়সারা গোছের। অথচ কাকাবাবু বলেছিলেন,মৃণ্ময়ীকে চিন্ময়ীরূপে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। নিখুঁত  মূর্তি ভিন্ন তা সম্ভব নয়। সেকারনেই তো কোনার্কের সূর্য মন্দিরে ভাঙা দেবমূর্তির পুজো হয়নি। তবে এই শারদ উৎসবে এমন কেন। টিনটিনকে বোঝানো  সন্তুদের কম্ম ছিল না। নেহাৎ ঋজুদার সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনিই বোঝালেন টিনটিনকে। সত্যি সব ব্যাপারটাই যে লোক দেখানো তা ভেবে খারাপই লাগছিল। এ যেন আমাদের নিজেদের মনেরই প্রকাশ। সামনে থেকে সব সাজানো,প্রেজেন্টেবল রাখা। সে ইন্টারভিউ বোর্ডেই হোক বা পুজোর বেদী। পেছনদিক তো আর দেখা যাবে না,তাই ওটা ওমন রাখলেও চলে। শ্রম বাঁচে,অর্থ বাঁচে। বেশ কিছুক্ষন আড্ডার পর ঋজুদাকে বিদায় দিয়ে কুমোরটুলির পাঠ চুকিয়ে চলে আসা হল কলেজ স্ট্রীট। দোকানে দোকানে বই বহর দেখে টিনটিনের সেকি পুলক। বাংলায় টিনটিনের কমিক সিরিজের সবকটি আর ফেলুদা, ব্যোমকেশ, বিভূতি ভূষণ এমন প্রচুর বই কিনে ফেললেন টিনটিন। জোজোর আবার বই দেখলে ক্ষিদে পায়,তার উপর আবার টেনিদার সাথে দেখা। রকে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। টিনটিনকে পেয়ে ডি ল্যা গ্র্যান্ডি বলে সে কি লাফ আর লাভ বলতে টিনটিনের খরচে দিলখুশায় চিকেন কোবিরাজি।


৮।প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে

মহালয়া থেকে পুজোর দিন অবধি আর তেমন ঘোরাঘুরি হয় নি। কেবল সকাল সন্ধ্যে একটু আড্ডা, নন্দনে মুভি আর বিভিন্ন নির্মীয়মাণ প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরেই সময় কাটিয়েছেন টিনটিন। শহর জুড়ে আলোর মরশুম আসছে তা বেশ ভালোই বুঝেছেন টিনটিন।দারুন দারুন সব পোস্টার আর ব্যানারে ছেয়ে গেছে শহর কোলকাতার আকাশ।শহরের ধারে যা কিছু দৃষ্টিকটু, তা মুছে দিতে পুজো কমিটি যে অতিশয় পটু তাও স্পষ্ট।দিব্বি দান ধ্যানের হুজুগও উঠেছে। পথশিশুদের নতুন জামা দিয়ে হাসি মুখে সুন্দর ছবি তুলে বেশ ফেসবুকের প্রোফাইল সাজানো হয়েছে।কথা থেকে চরণ দাশ এসেছে। সে তো বরাবরই অবাক। টিনটিনের সাথে বেশ জমে গেছে। সেদিন ম্যাডক্স স্কয়ারে বসে চরণ দাস দোতারা বাজিয়ে গান গাইছিল। অমনি টিনটিন গিয়ে পাকড়াও করলেন।


—খাশা গান। কে বাপু তুমি?

—আমি চরণ দাস।

—এক খান গান শোনাও না ভাই।


চরণ দাশও  গান ধরলে।


আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় ওরে ভাইরে! আমি যেই দিকেতে চাই দেখে অবাক বনে যাই আমি অর্থ কোথাও খুজি নাহি পাইরে, ভাইরে – আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।

টিনটিন নিজেও তো কোন অর্থ খুজে পাচ্ছিলেন না। প্রাসাদসম সব প্যান্ডেল। অর্থের বিপুল লেনা দেনা কোথায় যেন উৎসবের আসল আমেজের মুদ্রাদোষ মনে হচ্ছিল। ষষ্টি থেকে নবমী পর্যন্ত ঠাকুর দেখে টিনটিনের মনে হয়েছে ওর থেকে বিপ্লবীদের দঙ্গলে দৌড়ে বেড়ানো সহজ ছিল। তাই ঠিক করলেন পুজোর শেষ দিনটা কাটাবেন শহর থেকে দুরে।কাকাবাবুই বললেন টাকি চলে যেতে, ইছামতি নদিতে ভাসান দেখতে।


৯।হাসনাবাদ লোকাল

শেষ মুহূর্তে সব ঠিক হওয়ায় একটু তাড়াহুড়ো করতে হল। টিনটিনও গোঁ ধরলেন গাড়ি করে জাবেন না। লকাল ট্রেনে চেপেই যাবেন। তাঁরে সবাই করে মানা, বলে আর কিছুতে যানা - কিন্তু টিনটিন নাছোড়। অগত্যা শিয়ালদা থেকে সন্ধ্যের হাসনাবাদ লকালে চেপে যাত্রা শুরু হল।একে পিলপিল মানুষের ভিড়, সঙ্গে গজা, ঝালমুড়ি, ছোলা মশলার বিকিকিনি দেখে টিনটিনের অবস্থা কাহিল। সমানে সবাই একটু চেপে বসবেন একটু চেপে বসবেন করে উতক্ত্য করেই চলেছে। টিনটিনও কাকে যেন ফোনে ধরার চেষ্টা করছেন।সন্তুও খেয়াল রাখছে। সন্তু এর মধ্যে আবার এক ডেইলি প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে ঝামেলা আরম্ভ করল। তারা বেশ মনের আনন্দে জায়গা জুড়ে ব্রিজ খেলছিল। জোজো উপযাচক  হয়ে ব্রিজের সাতকাহন শেখাতে চাইছিল। কে কি ভুল করল,প্রোবাবিলিটি অনুসারে ঠিক নয় নম্বর দানে স্প্রেডের গোলাম দিয়ে কিভাবে পিট পাওয়া যেত বোঝাতে যেতেই রগচটা তাসুড়ে গালাগাল করে বসল জোজোকে। সামলানো দায়। গরমে আর ঝগড়ায় ঘেমে টিনটিন ক্রমশ লাল হয়ে উঠতে লাগলেন। স্টেশনের পর স্টেশন যায়,লোক আর কমে না। বরং বাড়তেই থাকে জিওমেট্রিক প্রোগ্রেশনে। ফোনের নেটওয়ার্কও ঠিকমত থাকছে না,কেবল যাতায়াত  করছে। অবশেষে টিনটিন ফোনে পেলেন গোপীনাথ গায়েন কে, মানে গুপী-বাঘার গুপীকে।


—হাই গুপীদা,টিনটিন বলছি।

—কেমন আছো? বেলজিয়াম থেকে নাকি?

—আরে না ভাই কলকাতায় এসেছি।

—সেতো শুন্ডী থেকে পোয়াটাক পথ। চলে এস।

—এবার আর হবে না। টাকি যাচ্ছি। দশমী দেখতে। তোমরাই চলে এস না ব্রাসেলসে।

—এখন এই বুড়ো বয়সে ওতটা প্লেন জার্নি শরীরে সইবে না যে।

—প্লেন কেন? জুতো পরে তালি দিলেই তো হয়।

—সে আর নেই। বাঘাদা ভুল করে ওএলএক্সে বেচে দিয়ে স্নিকার কিনেছে মর্নিং ওয়াক করার।

—কেলো করেছে।


টিনটিনের গলায় কেলো শুনে সন্তু আর জোজো দুজনেই তাকালো টিনটিনের দিকে। নেটওয়ার্ক চলে যাওয়ায় ফোনও গেল কেটে। সন্তুদের অবাক হতে দেখে টিনটিনই বললেন — " সেদিন রবীন্দ্রসদন মেট্রোতে শুনলাম কথাটা ।"


যা হোক লোকাল ট্রেনের সখ যে টিনটিনের ভালোই মিটেছে বোঝাগেল। টাকিতে এসে টোটো চেপে নদীর ধারের গেষ্ট হাউসে এসেই পুরো ফ্ল্যাট।



১০। শুভ বিজয়া

সকাল থেকেই উৎসাহ তুঙ্গে। নদীর পাড়ে জমিদার বাড়ির দালানে বাজছে ঢাক। লাল হয়ে সূর্য উঠছে আকাশ জুড়ে। বিএসএফ টহল দিচ্ছে নদীতে। একদল গামছাওয়ালা এসে জুটেছে। টিনটিন যতই বলুক যে সে গামছা ব্যবহার করে না, তাড়া জোঁকের মতন লেগে আছে। টিনটিন বাধ্য হয়েই একজোড়া কিনলো,মানিকজোরকে উপহার দেওয়া যাবে। ইছামতীর পাড়ে বসে বেশ চা-পর্ব চলছিল, কুট্টুস বাঁদরামো করে একটা ছাগলের কান কামড়ে দিতেই বিপত্তি। মানুষে বাঁদরামো করলেও কুকুরে যে করে না তাই জানা ছিল। সত্যি জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই। বেলা বাড়তেই শুরু হল ধুম। পঞ্জিকামতে বিসর্জন হয়ে যেতেই সিঁদুর খেলা আর নাচে সে পুরো রক কনসার্ট। টিনটিন তো হোলি ভেবে রঙ বরষে গেয়ে ফেলল। গেস্ট হাউসে দুপুরে মাংসের ঝোল আর পার্শের ঝাল খেয়ে লাইন দেওয়া হয়েছে নদীর পাড়ে। তিল ধারণের স্থান থাকলেও মানুষ ধরার জায়গা নেই। কাকাবাবু বলে রাখায় সরকারী লঞ্চে করে নদীতে ভেসেই ভাসান দেখার ব্যবস্থা হল। দুগ্গি দেখতে চাচা,ঠাকুর দেখতে নানিরাও কেমন চলে আসে। ধর্মের বেড়া নেই। মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়। কিন্তু ঘোর কাটতে সময় লাগেনা। নদী ভর্তি হয়ে যায় প্রতিমায়,সঙ্গে মাদকের গন্ধ আর উৎকট সঙ্গীতে ঐতিহ্যের বারোটা বেজে যায়। তবু মুগ্ধবোধ ব্যকরণের মতন চোখে টিনটিন দেখছিলেন দুর্গার ভাসান। মা বোধহয় হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। পাড়ের কাছে গোলমাল হচ্ছিল। চেনা লোক দেখে লঞ্চ পাড়ে ভেরাতে বললেন টিনটিন। পুলিশ আর স্থানীয় কয়েকজন এক হলদে পাঞ্জাবী পড়া লোককে পাকড়াও করেছে। ইমেগ্রেশন রুল ভায়োলেট করেছে নাকি। টিনটিন এগিয়ে গেলেন ভীড়ের মাঝে।


—আরে কি করছেন। ওকে ছাড়ুন।

—ও কি আপনার সাথে? তবে তো আপনাকেও ধরতে হয়।

—ধরবেন মানে? জানেন আমি রাষ্ট্রীয় অতিথি?

—কে আপনি?

—আরে আমি টিনটিন।

—এমন বুড়ো হয়ে গেছেন, চিনতেই পারিনি, সরি।

—তা বলে ওনাকে টানাটানি করছেন কেন?

—উনি, অনুপ্রবেশকারী। উৎসবের সুযোগ নিয়ে ওপাড় থেকে চলে এসেছেন।পাস-পোর্ট, ভিসা কিস্যু নেই।

—বয়েই গেছে অনার। আপনি ওনাকেও চেনেন না বুঝি?

—এমন লোক আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি।

—ঘোরার ডিম চেনেন।রাতে মগন লাল মেঘরাজ দের সাহায্য করবেন আবার দিনের বেলায় আম জনতাকে হেনস্থা। আপনাদের মতন অফিসারদের জন্যই পুলিশ-প্রশাসনের এত বদনাম এদেশে।

—আপনি কিন্তু বিলো দ্য বেল্ট চালাচ্ছেন। নেহাত ছেলেবেলার হিরো, তাই এখনও সহ্য করছি।

—কি আমার ফ্যান এলেন রে।আরে এই ভদ্রলোক হলেন হিমু। বাংলা বই ত পড়েন না। তাই মিশির আলি কেউ চেনেন না? হিমুদের কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে আতকাতে নেই।

—উনি কি করেন?

—সাইকলজি বলতে তো খালি ফ্রয়েড বোঝেন, তাই হিমুর ব্যাপারটা বাদ দিয়ে ওদিকে দেখুন, ভীরের সুযোগ নিয়ে কতা বদমায়েশ একটা মেয়েকে জ্বালাতন করছে। মানে ইভ-টিজিং হচ্ছে। ওদিকটা সামলান। হিমু বাবুকে আমরা নিয়ে গেলাম। টিনটিনের কথায় থতমত খেয়ে পুলিশ গুলো অন্যদিকে কেটে পড়ল। লাজুক হিমু আবার মিশে গেল লোকের ভিড়ে।


একটা কুকুর ডেকে উঠলো-ভউউউউ! এতো কুট্টুসের গলা না। আরে এতো পঞ্চু!পান্ডব গোয়েন্দা সদলবলে হাজির। বাবলু এসে সবার সাথেই আলাপ করিয়ে দিল টিনটিনের। কুট্টুসও বন্ধু পেল একটা। গেস্ট হাউসে ফিরে মালপোয়া আর কাঁচাগোল্লা সহযোগে কোলাকুলি করে সবাই বিজয়া পর্ব সেরে ফেলল। রাত বেশ হয়েছে, সবাই বেশ আড্ডার মুডে। সেই কোলকাতা আসা ইস্তক অনেক অভিজ্ঞতা হল টিনটিনের। ঝক্কিও কম হয়নি।কেবল মনে ইচ্ছে ছিল কাকাবাবুকে নিয়ে কনিস্কের হারিয়ে যাওয়া মুণ্ডুটা বা সেই রক্তমুখী নীলা অথবা জং বাহাদুর রানার ভোজালিটা স্মারক হিসেবে বেলজিয়ামে নিয়ে যাবার। কিন্তু আর কোলকাতা ফিরে সব্বার সাথে দেখা করে সে শখ মেটানোর সময় নেই, আর বাস বা লোকাল ট্রেন চড়ে ট্রাভেল করার এততুকুও ইচ্ছে নেই। জোজো চিন্তিত কিভাবে ফেরা হবে। টিনটিন বললেন চিন্তার কিছু নেই টুক করে আমারা সবাই আবার বইয়ের পাতায় ঢুকে যাই।তারপর বইটা ডাকহরকরা ঠিক গেছো দাদা কে দিয়ে দেবে।কাকেশ্বর কুচকুচে অঙ্ক কষে ঠিক রানাঘাট, ডায়মন্ড হারবার হয়ে তিব্বত বা ব্রাসেলস চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে আর বাকিরাও হাতে হাতে যে যার বাড়ি। পৌঁছে সবাই খবর দিও। ওদিকে পাপাঙ্গুলেরাও ছাকনি চড়ে সাগর পাড়ি দিতে বেড়িয়েছে। শুভেচ্ছা রইল। টাটা। এভাবেও ফিরে যাওয়া যায়।



249 views
  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.