• Blogtog

লোকচক্ষুর আড়ালে ঢাকা পরে থাকা নাৎসীদের সহধর্মিনীদের বিভিন্ন দিক

নম্রতা সেন।

ইতিহাসে যদি একটু খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তাহলে বোঝা যাবে মানবসভ্যতার বিকাশে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের ভূমিকাও যথেষ্ট। অথচ কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেটা লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীরা এই সমস্ত স্মরণীয় ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত না হলেও সাক্ষী হয়ে কালের আবর্তে ঠাঁই নেয়।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এর সময় যেই উল্লেখযোগ্য বিষয়টা চলে আসে তা হলো জার্মানির এডলফ হিটলারের কথা অর্থাৎ হিটলারের নাৎসী বাহিনীদের কথা। আমরা যতটা হিটলার, গোয়েবেলস এর কথা জানি ,তাদের সহধর্মিণী বা প্রেমিকাদের যা ভূমিকা ছিল তা পর্দার আড়ালেই ঢাকা পরে আছে। তাদেরকে নিয়ে আজ একটু আলোকপাত করে দেখা যাক।



এভা ব্রাউন:

এভা ব্রাউন

এভা ব্রাউন ছিলেন এক অসামান্য নারী যিনি নাৎসীদের মাঝে নিজেকে বিশ্বস্ত প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।


এভা তার জীবনের বারোটা বছর হিটলারের সান্নিধ্যে থেকে তাকে আমরণ ভালোবেসে গিয়েছিলেন। হিটলারের গাড়ির চালকের মতে সমস্ত জার্মান মহিলাদের মধ্যে এভা ছিল সব থেকে অসুখী নারী। বাড়ির পিছনের সিঁড়ি ব্যবহার করতেন। হিটলার এভাকে প্রেমিকা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও , বিয়েতে তার অসম্মতি ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন বিয়ে বা সংসার যাপন করলে নাৎসী বাহিনীদের প্রধান হওয়ার আদর্শ ও ব্রত থেকে বিচ্যুত হতে পারেন। যদিও পরবর্তীকালে এই ধ্যান ধারণা কে বিসর্জন দিয়ে ১৯৪৫ সালে ৫৬ বছর বয়েসে ৩৩ বছর বয়েসই এভা ব্রাউনের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন, কিন্তু সেই বিয়েটি ৪৮ ঘণ্টাও পেরতে পারেনি তার আগেই এভা এবং এডলফ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।




মাগডা গোয়েবেলস:

মাগডা গোয়েবেলস

তৃতীয় রাইখের ফার্স্ট লেডি খেতাবে পরিচিত ছিলেন নাৎসী বাহিনীর প্রধান স্পিকার জোসেফ গোয়েবেলস এর সহধর্মিনী মাগডা গোয়েবেলস। মাগডা তার প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের পরে ১৯৩০ সালে জোসেফ গোয়েবেলস এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং ছয়টি সন্তান জন্মায় তাদের ঘরে। নাৎসী আরিয়ানদের যে সকল আদর্শ ছিল তা সব কিছু পালন হতো মাগডা গোয়েবেলস এর পরিবারে। এবং তার জন্যই হিটলার তাকে "তৃতীয় রাইখের শ্রেষ্ঠ মা” খেতাব দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীবাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত জেনে মাগডা তার ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্তানদের অস্পষ্ট ও অন্ধকারচ্ছন্ন ভবিষ্যতের কথা ভেবে ১৯৪৫ সালের ১ মে ছয়টি সন্তানের মুখে মারণ ঘুমের ওষুধ তুলে দেন। এবং দুদিন ধরে তাদের মৃতদেহের সামনে বসে অঝোরে কেঁদে যান, এবং এরপরই গোয়েবেলস দম্পতি আত্মহননের পথ বেছে নেয়।


লেনি রেইফেনস্তালঃ


জার্মানি নাৎসী দের আমলে এই নারী ছিলেন একজন উদীয়মান চিত্রপরিচালকা ও অভিনেত্রী। তার সংস্কৃত জীবন একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে শুরু হলেও পরে তিনি চিত্রপরিচালনার দিকে মনোনিবেশ করেন। ১৯৩২ সালে নাৎসীদের একটি সমাবেশে হিটলারের সাথে তার পরিচয় হয়। হিটলার তার মেধা ও পারদর্শীতার কথা শুনে তাকে নাৎসী ও নুরেমবার্গ এর জেপেলিং ক্যাম্প নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে বলেন। লেনি রেইফেনস্তাল সেই ছবি তৈরি করে হিটলার কে দেখানোর জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং হিটলার সেই ছবি দেখে প্রচণ্ড ভাবে অভিভূত হয়ে পরেন। এরপরেও তিনি বেশ কিছু নাৎসী দের পক্ষে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা মূলক ছবি নির্মাণ করে নাৎসীদের আস্থাভাজন হন এবং একটা সময় হিটলার ও গোয়েবেলসের খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠে।


যুদ্ধশেষে ফ্রান্স সরকার তার বিরুদ্ধে নাৎসীদের সহযোগিতা করার জন্য বিচারিক অভিযোগ গঠন করে। তা ছাড়া হিটলারের প্রেমিকা হিসেবেও তাকে অভিযুক্ত করা হয়। রেইফেনস্তাল তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে। অবশেষে অনেকদিন বিচার চলার পর তাকে রেহাই দেওয়া হয় কিন্তু তার সব সম্পত্তি ফ্রান্স সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়।


এম্যি গোরিং:

এম্যি গোরিং

১৮৯৩ সালে জার্মানের হামবুর্গ শহরে জন্ম। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ বিক্রেতা ও নাট্যশিল্পী । তাছাড়া তার লোভী ও উচ্চাভিলাষী চরিত্রের কারণে জার্মান সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ১৯১৬ সালে এক জার্মানি নায়ককে বিয়ে করেন কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তাদের। তারপরে এম্যি গোরিং দ্বিতীয়বারের জন্য বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন জার্মানির নাৎসীবাহিনীর কম্যান্ডার ইন চিফ , হেরমান গোরিং এর সাথে। এম্যি ছিলেন হেরমেন এর দ্বিতীয় স্ত্রী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই এম্যি গোরিং হোস্টেজ অর্থাৎ সেবিকা হিসেবে হিটলার এর সাথে বহু জায়গায় অংশগ্রহণ করে।হিটলারের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে একটা পর্যায়ে এসে তিনি নিজেকে তৃতীয় রাইখের ফার্স্ট লেডি হিসেবে ভাবতে শুরু করে, ফলে দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষ শুরু হয়ে যায় হিটলারের প্রেমিকা এভা ব্রাউন এর সাথে। একটা সময় এম্যি গোরিং , এভা ব্রাউনকে প্রকাশ্যেই হেয় এবং হেলাফেলা করতে থাকেন। পরিস্থিতি এতোটাই চরমে ওঠে যে হিটলার হেরমেন গোঁরিং কে ডেকে এনে, এভা ব্রাউনের সাথে সম্মানজনক ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন এম্যি গোরিং কে।


যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আদালত তার স্বামীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে এবং নাৎসীদের সহযোগিতা করার অভিযোগে তাকে ১ বছরের কারাদণ্ড সহ তার ৩০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।


এই ছিল নাৎসীদের সহধর্মিনীদের বিভিন্ন দিক যা লোকচক্ষুর আড়ালেই ঢাকা পরে আছে।


পড়ুনঃ


  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.