• Blogtog

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের দৈন্যতা - মেঘদূত রুদ্র



- মেঘদূত রুদ্র।

“ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, প্রথমবার বিয়োগান্ত নাটক রূপে, দ্বিতীয়বার ভাঁড়ামি রূপে”- কার্ল মার্ক্স

আগস্ট মাসের নয় তারিখ অর্থাৎ গত পরশুদিন ছেষট্টি তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারের ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। তারপর থেকেই এই বিষয়টা নিয়ে একটা লেখা লেখবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিভিন্ন বিষয়ে পুরস্কার পাওয়া ‘বাধাই হো’ ছবিটা দেখা ছিলনা। গতকাল সেটা দেখলাম। আরও টুকটাক কিছু হোম ওয়ার্ক করে নিয়ে ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আজকে অর্থাৎ রবিবার, সুন্দর ছুটির দিনে লিখতে বসব। কিন্তু আজ সকালে পটি ক্লিয়ার হলো না। এমনিতে এরকম সচরাচর হয়না। কিন্তু আজকেই হল। ফলে দুদণ্ড স্বস্তিতে বসে যে লিখবো তার আর জো রইল না। কিন্তু কি আর করা যাবে। জীবনে নানাবিধ এত কাজ আছে যে সেগুলোকে মোটামুটি একটা রুটিনে ফেলে না করলে ব্যালেন্স করা যায়না। ফলে নিরুপায় হয়ে আজকেই লিখতে বসলাম।


প্রথমেই আসি বাংলা ছবির কথায়। এবারে তিনটে বাংলা ছবি পুরস্কার পেয়েছে। সেরা সংলাপ বিভাগে চূর্নী গাঙ্গুলি পরিচালিত ‘তারিখ’, সেরা বাংলা ছবি বিভাগে সৃজিত মুখার্জীর ‘এক যে ছিল রাজা’ এবং স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড বিভাগে ইন্দ্রদীপ দাসগুপ্তর ‘কেদারা’। ত্রুটি মার্জনা করবেন কারণ ‘নন ফিচার ফিল্ম’ ক্যাটেগরিটাকে আমি আমার আলোচনায় আনছি না। কারণ নন ফিচার, ডকুমেন্টারি এগুলো আমার কাজের এরিয়া নয়। প্রাকটিসের এরিয়াও নয়। এগুলো আমার জ্ঞান পরিধির বাইরের। ফিকশন বিভাগে পুরস্কার পাওয়া তিনটি ছবির মধ্যে ‘তারিখ’ আমি দেখিনি। ‘কেদারা’ প্রথম কুড়ি মিনিট দেখেছি। ‘এক যে ছিল রাজা’ পুরোটা দেখেছি। ‘কেদারা’ কুড়ি মিনিট দেখেছি কারণ তার বেশি বসে দেখতে পারিনি। ‘এক যে ছিল রাজা’-র ক্ষেত্রেও সেটাই করতাম, যদি না এই ছবির রিভিউ লেখার জন্য সেই সময় একটি পত্রিকাকে কমিট করে থাকতাম। কি অদ্ভুত! এইটা লিখতে লিখতেই পটি পেয়ে গেলো। বাকিটা করে এসে লিখছি। আসা করছি ব্রেকের পর কিছু ভাল ভাল কথা লিখতে পারবো।


হ্যাঁ যা বলছিলাম। বাংলা ছবির কথায় আপাতত পরে আসছি। হিন্দি ছবিগুলি নিয়ে আলোচনা করা যাক। হিন্দি ছবি করিয়েরা তাদের ছবিতে একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড রাখার চেষ্টা করে। তার ফলে খুব খারাপ ছবির মধ্যেও কিছু না কিছু যত্ন, এক্সপার্টাইজ, টুকটাক প্রতিভার ঝলক ইত্যাদি দেখা যায়। আর ভাল ছবি হলে তো আর কথাই নেই। চুপটি করে বসে শুধু উপভোগ করে যেতে হয়। সঙ্গম সুখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে পুরস্কার পাওয়া ‘অন্ধাধুন’, ‘বাধাই হো’, ‘পদ্মাবত’ আমি দেখেছি। হিন্দিতে ডাব করা ‘K.G.F: Chapter 1’ আমি কিছুটা দেখেছি। ‘প্যাডম্যান’, ‘উরি : দা সার্জিকাল স্ট্রাইক’ দেখিনি। আর ‘Kadhak’ নামক একটি ছবি স্পেশাল মেনশন পেয়েছে সেটার নাম শুনিনি। এছাড়া মালায়ালাম ছবি ‘ওলু’ ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন ভাষার ছবিগুলি আমার দেখা হয়নি। কিছু কিছু দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব। দেখে নিয়ে লেখাটা লিখতে পারতাম। তাতে ব্যাপ্তিটা হয়ত অনেকটা বেশি হত। কিন্তু সেটা করতে অনেকটা সময় লাগত। এবং তাতে লেখার তাৎক্ষনিক স্বতঃস্ফূর্ততা ব্যপারটা নষ্ট হয়ে যেতো বলে আমার ধারণা। কে কোন ক্যাটেগরিতে পুরস্কার পেয়েছে সেটা কম বেশি সবাই জানে। না জানলেও সেটা গুগল করলেই পাওয়া যাবে। ফলে তার ডিটেইল্ড ডেসক্রিপশন আমি দিচ্ছিনা। তবে কথা প্রসঙ্গে কয়েকটা মেনশন করতে পারি। ‘অন্ধাধুন’ আর ‘বাধাই হো’ বেশ কয়েকটা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ‘অন্ধাধুন’ পেয়েছে সেরা হিন্দি ছবি, সেরা অভিনেতা, সেরা অ্যাডাপ্টেড চিত্রনাট্য বিভাগে। আর ‘বাধাই হো’ পেয়েছে সেরা পপুলার ছবি ও সেরা সহ অভিনেত্রী বিভাগে। দুটোই খুব ভাল ছবি। বিউটিফুল ছবি। খুবই যোগ্য ছবি। আরও কয়েকটা পুরস্কার বেশি পেলেও আমার কিছু বলার ছিলনা। ছবি দুটোর কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলব। ‘বাধাই হো’র জন্য সেরা সহ অভিনেত্রী বিভাগে পুরস্কার পাওয়া সুরেখা সিক্রি যে কি ভাল অভিনয় করেছে সেটা বলার নয়। অসাধারণ। এরকম অভিনয়ের পদযুগলে প্রাণ হাজির। এই ছবিতে সবাই ভাল অভিনয় করেছে। তেমনি মিষ্টি ছবির গল্প। গোছানো চিত্রনাট্য। একেকটা দৃশ্য প্রচুর যত্ন করে ডিজাইন করা। অনেকদিন পর একটা ছবি দেখে প্রাণ খুলে হেসে আর মন ভরে কেঁদে খুবই তৃপ্তি পেলাম। আর ‘অন্ধাধুন’-এর কথা আর কি বলব। রিলিজের সময়তেই দেখেছিলাম। এখনই রেশ কাটেনি। শ্রীরাম রাঘবন আমার খুবই প্রিয় একজন পরিচালক। মূলত থ্রিলার বানায়। হিচককের ভক্ত। গুরুর যোগ্য ভাব-শিষ্য। গুছিয়ে ছবি বানায়। এই মুহূর্তে ইনিই আমার চেনা একমাত্র ব্যক্তি যাকে আমি খুশি মনে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে পারি। এই ছবির জন্য আয়ুষ্মান খুরানা সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছে। দারুণ অভিনেতা। বহু বছর আগে ‘ভিকি ডোনার’ দেখে ওকে ভাল লেগে গেছিলো। এখন তো আরও ম্যাচিওর হয়েছে। সোনা ফলাচ্ছে। পটি পরিষ্কার হওয়ার দৌলতে অনেক ভাল ভাল কথা বললাম। এবার আমার যে নিজস্ব চরিত্রে ফিরে আসি।


পড়ুনঃ


আয়ুষ্মানের সাথে এই পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছে ভিকি কৌশল। ‘উরি...’ ছবিটির জন্য তিনি এই পুরস্কারটি পেয়েছেন। ভিকি কৌশল! আপাত সেন্সিবল টাইপের দেখেতে একটা ছেলে এত ননসেন্স কিভাবে হয় সেটা ভেবে আমি মাঝে মাঝেই অবাক হই। লুকস বাদ দিয়ে বাকি সব দিক থেকেই আয়ুষ্মান যদি কাশ্মীরের উল হয় তাহলে ভিকি হল ...। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। আমার এক গুরুর কথা শুনে লেখায় খারাপ কথা আর খিস্তি-খামারি ব্যবহার করা আমি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি। সে যাই হোক। কিন্তু এই পুরস্কার ওকে দিতেই হত। আর এখানেই ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডে সরকারি ইন্টারভেনশন আর লবির ব্যপারটা সামনে চলে আসে। এটা বহু পুড়নো ও বহুল চর্চিত বিষয়। একসময় বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, পরবর্তীতে ঋতুপর্ণ ঘোষ ইত্যাদিরা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডটাকে ঘর-বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিল। ছবি বানালেই বলে বলে পুরস্কার। কিন্তু তাদের একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল। তারা যেই যেই ছবির গুলির জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন সেগুলির বদলে অন্য কোন কোন ছবি সেই পুরস্কার গুলি পেতে পারতো তাই নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা হতে পারে, বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু সেটা কখনই খিল্লির বিষয় নয়। কিন্তু এবছর এবং বিগত বেশ কিছু বছর ধরে এমন কিছু কিছু ছবি লবি এবং দেশভক্তির জোড়ে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে যেগুলোর কথা ভাবলে একজন সিরিয়াস সিনেমা প্রেমী হিসেবে হাসি পায়। আমার ধারণা আমার মত অনেকেরই পায়। ব্যপারটা এমন পর্যায় চলে এসেছে যে খিস্তি মারতেও আর ইচ্ছে করেনা। যেমন ‘উরি...’। আপাদ মস্তক একটা মোটা দাগের দামড়া ছবি। ভারত মাতা কি জয় আর পাকিস্তান মুর্দাবাদ এই হল ছবির একমাত্র বক্তব্য। অনেকে বলবে আপনি তো ছবিটা দেখেননি। তাহলে কিভাবে এরকম জেনারালাইজ করছেন। আসলে দেখার প্রবৃত্তি হয়নি। যেমন বাংলা ছবি দেখারও আর প্রবৃত্তি হয়না। কালে ভদ্রে একটা দুটো দেখি। ‘উরি...’ দেখার তেমন কোন প্রয়োজন নেই। ঘটনা খবরের কাগজে বেরিয়েছে, টিভিতে ডিটেইলে দেখিয়েছে, চাইলেই সব তথ্য ( সত্যি মিথ্যে সব) ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। চাইলেই পড়ে-দেখে নেওয়া যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল আম জনতা সেটা করেনা। কিন্তু ছবি হলে সেটা দেখে। এবং যুগে যুগে ‘বর্ডার’, ‘এল.ও.সি কার্গিল’, ‘গদর’, ‘অব তুমহারে হাওয়ালে বতন সাথিও’ নামক দামড়া সিনেমাগুলি দেখে এক শ্রেণির ভারতীয়রা তাদের যাবতীয় দুঃখ কষ্ট ভুলেছে। পেটে ভাত নেই তো কি হয়েছে, চাকরি নেই তো কি হয়েছে, রান্নার গ্যাস আর পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ছে তো কি হয়েছে, একে একে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তো কি হয়েছে, তার যেরে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারাচ্ছে তো কি হয়েছে? পাকিস্তানকে তো উচিত শিক্ষা দেওয়া গেছে। এটা কি কম গর্বের। আমার এই ধরণের চোখে ঠুলি পরা দেশপ্রেম নেই। ফলে এই ধরণের ছবি আমি দেখিনা। কিন্তু ‘উড়ি’কে পুরস্কার দিতেই হবে। নইলে পাকিস্তানকে শিক্ষা দেওয়া, মুসলমানরা কত খারাপ এই ধরণের ঘটনা নিয়ে ছবি বানানোর লোকেরা উৎসাহ পাবে কিভাবে। তাদের তো সরকারি মান্যতা দিতে হবে। নির্লজ্জ ভাবে পিঠ চাপড়ে দিতে হবে। আমি তো ভাবছিলাম কংগ্রেসের গুষ্ঠির তুষ্টি করা ছবি ‘দা অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ নামক কালজয়ী দামড়া ছবিটিকে হয়ত সেরা ছবির পুরস্কার দিয়ে দেবে। দেখলাম মিনিমাম লজ্জা-সরমের খাতিরে সেটা পারলনা। আর পারলনা বলেই ‘উরি...’-র কপালে শিকে ছিঁড়ল। সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেলেন পরিচালক আদিত্য ধর। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ধর মহাশয়ের কেরিয়ার সিকিয়োর্ড। আরও বেশ কিছু দাপাদাপি টাইপ ছবি আগামী পাঁচ বছর আমাদের দেখতে হবে। ‘পদ্মাবত’ আবার ঘুরিয়ে বিজেপি। এলাহি পিরিয়ড ছবি বানিয়ে প্রমাণ করেছে যে আলাউদ্দিন খিলজি নামক একজন মুসলমান কত খারাপ। আসলে মুসলমান জাতটাই খারাপ। আহা আহা কি সুন্দর সাবজেক্ট! ধন্য বনশালি মশাই আপনি ধন্য। একে তো শুধু বিশাল বিশাল সেট আর কস্টিউম সর্বস্ব ফিল্ম মেকার হয়ে গেছে। তারপর এই বিষয় নির্বাচন। সত্যজিৎ রায় অযথাই একের পর এক ছবিতে মানবতাবাদের কথা বলে এসেছেন। উনি হয়ত ততটা বুদ্ধিমান ছিলেন না, তাই জানতেন না যে বিদ্বেষ নিয়ে ছবি বানালে বলে বলে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া যায়। কিন্তু মজার বিষয় উনি কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছিলেন। ফলে এইসব নিয়ে উনি বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না। এরপর আসে অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘প্যাডম্যান’ ছবির প্রসঙ্গ। অক্ষয় কুমারকে আমার বিগত কিছু বছর ধরে অভিনেতা কম আর সরকারি চাকুরীজীবী বেশি বলে মনে হচ্ছে। পার্থক্য হচ্ছে অধিকাংশ সরকারি কর্মীদের মত উনি ফাঁকি দেন না। নিরলস ভাবে সরকারের হয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন। ২০১৪-এ এন.ডি.এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই উনি ‘হলিডে’, ‘বেবি’, ‘গব্বর ইজ ব্যাক’, ‘এয়ারলিফট’, ‘জলি এল.এল.বি-২’, ‘টয়লেট: এক প্রেম কথা (সরকারি স্বচ্ছ ভারত অভিযানের ডাইরেক্ট মুখপত্র), ‘প্যাডম্যান’, ‘গোল্ড’ ইত্যাদি ছবিগুলি করে আসছেন। ‘মিশন মঙ্গল’ ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায়। ১৫ই আগস্টের পবিত্র দিনে ছবিটি মুক্তি পাবে। একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পাবো যে ওনার অভিনীত অধিকাংশ ছবিগুলির বিষয়বস্তু হয় পাকিস্তান আর মুসলমান খারাপ, নইলে মেরা ভারত মহান অথবা সমাজ সংস্কারমূলক (প্যাডম্যান, গব্বর ইজ ব্যাক ইত্যাদি)। এসবের পুরস্কার সুলভ ‘রুস্তম’ নামক একটি আনতাবরি ছবির জন্য উনি ২০১৬ সালের সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন। পাকিস্তান ইত্যাদি নিয়ে আগেই বলেছি। কিন্তু কথা উঠতে পারে যে সমাজসংস্কার মূলক ছবি করাটা খারাপ কি ব্যাপার। মেয়েদের স্যানিটরি ন্যাপকিন ব্যবহার করা উচিত বা মাঠে-ঘাটে পায়খানা না করে বাথরুমে করা উচিত ইত্যাদি কথাগুলি যদি কোন ছবি বলে তাহলে আপত্তির কি থাকতে পারে। আপত্তির কিছুই নেই। শুধু এটা ভেবে অস্বস্তি হয় যখন দেখি যে সমাজ সংস্কার বিষয়ক একটি ছবি যখন গুনোমানের দিক থেকে ছবি হিসেবে উৎরোয় না এবং তারপরেও কিছু লোক ছবিটিকে নিয়ে মাতামাতি করেন। এবং যখনই কিছু লোক এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলে বা বলে যে ছবিটা ভাল হয়নি তখনই ইনস্ট্যান্ট উত্তর আসে তাহলে কি আপনি এই ইস্যুটাকে সমর্থন করেন না। আপনি কি মেয়েদের প্যাড ব্যবহার করার বিরোধী? আপনি কি তাহলে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের বিরোধী? নির্বোধ বক্তব্য আসে ‘আহা অন্ধ নায়কটা কত কষ্ট পেলো আর এই আঁতেল বলে কিনা ছবিটা খারাপ। নিজের হলে বুঝত’। তখন আর কিছুই বলার থাকেনা। ছবিকে খারাপ বলা মানে যে ছবির বিষয়বস্তুর বিরোধিতা করা নয়, এটা অবুঝদের কিভাবে বোঝাই। গল্প ছাড়াও ছবির ভাল-খারাপ হওয়ার পেছনে আরও হাজার একটা বিষয়ের অবদান আছে। সেগুলো যথাযথ না হলে ক্ষুদিরাম বোস, নেতাজী বা সৌরভ গাঙ্গুলিকে নিয়ে তৈরি ছবিও খারাপ হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষ কিন্তু এসব বলেনা। তারা কিছুটা হলেও অন্যের কথা শোনার চেষ্টা করে। এসব বলে কিছু হাফ এডুকেটেড এবং চলচ্চিত্র বিষয়ক সম্পূর্ণ আন এডুকেটেড কিছু হামবড়া টাইপের মানুষেরা। আর এদের জন্যই যুগে যুগে অন্ধ মেয়ে, বোবা ছেলে, তরুণী বিধবা, ক্যানসার রুগী ইত্যাদিদের কষ্ট নিয়ে কিছু নেকুপুসু ছবি এবং সমাজ সংস্কারের নামে কিছু এন.জি.ও টাইপ নির্বোধ ছবি তৈরি হয়ে আসছে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্মাতারা এইসব সেন্টিমেন্ট ভাঙিয়ে টাকা কামানোর টেন্ডেন্সি নিয়ে ছবিগুলি বানাচ্ছেন এবং গুছিয়ে টাকা কামাচ্ছেন। আমি তো এই ভেবে বেশ চিন্তায় আছি যে যুগ যুগ ধরে চিত্র পরিচালকদের এহেন সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখে একদিন প্রকৃত সমাজ কর্মীরা যদি রেগে গিয়ে ছবি বানাতে শুরু করে তাহলে কি হবে। সব তালগোল পাকিয়ে যাবে। এরপর হয়ত কবিকে বলা হবে ছবি আঁক, গায়ক-গায়িকাকে বলা হবে রকেট সাইন্স নিয়ে কাজ কর, চিত্রকরকে বলা হবে পোলিং এজেন্ট হয়ে যাও ইত্যাদি। সে যাই হোক তবে বাস্তব ঘটনা হল সরকার তাদের এজেন্ডার সাথে মিলে যাওয়া এইসব ছবিগুলিকে পুরস্কার দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে। অক্ষয় কুমারের মত আকাট মূর্খ অভিনেতা সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাচ্ছে। আর ঠিক উল্টো কারণেই অনেক ছবিকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বেশীদিন আগের আলোচনায় যাব না। ২০১৬-এ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘উড়তা পাঞ্জাব’, ২০১৭-র ‘রইস’, ‘রেঙ্গুন’ ও ২০১৮-এ তৈরি হওয়া ‘মুক্কাবাজ’, ও ‘মুল্ক’-এর মত ভাল ছবিগুলির পুরস্কার না পাওয়ার একমাত্র কারণ হল যে ছবিগুলি কিছু বিশেষ বিশেষ যায়গায় সরকারের বিরোধিতা করেছে বা অস্বস্তিতে ফেলেছে। তার বদলে বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে ‘টয়লেট : এক প্রেম কথা’, ‘শিবায়’, ‘মেরি কম’, ‘বাজিরাও মস্তানির’ মত কিছু অ্যাভারেজ ও সরকারি লাইনের ছবি। দেশপ্রেমীরা বলতে পারে তাও তো বছরে দু-একটা সরকার বিরোধী ছবি তৈরি হচ্ছে। বামফ্রন্ট আমলে চৌত্রিশ বছরে পশ্চিমবঙ্গে তো প্রায় একটাও সরকার বিরোধী ছবি হয়নি। এরা তো তাও বছরে দুটো করে করতে দিচ্ছে। আহা আহা কি বিরাট উপকার করে দিয়েছে! ধন্য হয়ে গেছি। সি.পি.এম তো মহান। বিজেপি আরও মহান। ডেমোক্রেসির গলাটা একশ শতাংশ না টিপে পঁচানব্বই শতাংশ টিপেছে। এছাড়া এবছর ‘স্ত্রী’ আর ‘টুম্বার্ড’ এর মত পাওয়ারফুল ছবি দুটির (কোন এক অজ্ঞাত সরকার পন্থী কাজ না করার জন্য) কোন পুরস্কার না পাওয়াটাও অত্যন্ত লজ্জাজনক ঘটনা। এতো গেলো হিন্দি ছবির কথা। এছাড়া সারা দেশে অন্যান্য ভাষার কত যে ছবি এইভাবে বঞ্চিত হচ্ছে তার হিসেব করতে বসলে হয়ত চোখ কপালে উঠে যাবে। অনেকে বলবে আপনি তো সব দেখেন নি। তাহলে কিভাবে এত বড় বড় কথা বলছেন। তাদের একটাই কথা বলার সেটা হল আমি একটা প্রোবাবিলিটির কথা বলছি। আর আমি এও জানি যে সব ছবি দেখে এই লেখা লিখলেও আপনাদের মধ্যে অনেকেই সন্তুষ্ট হতেন না। কারণ সরকারের এই মনোভাব আর সিদ্ধান্ত গুলো আপনারা সমর্থন করেন। আর এও মনে করেন যে এইধরনের সিনেমা হওয়া উচিত এবং মাথায় তুলে নাচা উচিৎ। কে আপনাদের এই সব শিখিয়েছে আমি জানিনা তবে এটুকু জানি যে সিনেমা কোনো দালালিকে প্রশ্রয় দেয়না। কোন শিল্পই তা দেয়না। সিনেমা যদি অনেস্ট না হয় তাহলে শত জাতীয় পুরস্কারও সেই ছবিকে মানুষের মনে ঠাই দিতে পারবেনা। ‘পথের পাঁচালি’ আমরা আজও মনে রেখেছি কারণ ছবিটা আজও আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। কিন্তু পরিচালক মধুর ভাণ্ডারকরের ‘চাঁদনী বার’ ছাড়া আর কোন কোন ছবি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে সেটা আমরা চট করে বলতে পারবো না। কিন্তু দালালী করে আরও দুটো তিনি পেয়েছেন।


এবার আবার বাংলা ছবির প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বাংলা ছবি হচ্ছে চুমু। ‘এক যে ছিল রাজা’ সেরা বাংলা ছবির পুরস্কার পেয়েছে। কারণটা হল এই যে ছবিটির কোন রাজনৈতিক চেতনা নেই। পরিচালকের নিজেরও কোন রাজনৈতিক চেতনা আছে কিনা তা জানা যায়না। রাজ্যের বা দেশের কোন আর্থ, সামাজিক, রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে তিনি কখনও কোন মন্তব্য করেছেন বলে আমি শুনিনি। ফ্যাক্টরিতে যেভাবে পাইকারি দরে গামলা, বালতি, বদনা ইত্যাদি ম্যানুফ্যাকচার করা হয় সেভাবেই তিনি পাইকারি দরে একের পর এক ছবি তৈরি করেন। এবং সরা বছর ধরে সেই ছবিগুলি নিয়েই বিভিন্ন ভাল ভাল কথা বলে যান। আবার নিন্দুকেরা বলবেন- উনি তো দেশভাগ নিয়ে ‘রাজ কাহিনী’ বানিয়েছে। দেশভাগ নিয়ে ঋত্বিক ঘটক তিনটে ছবি বানিয়েছিল। তারপর এম.এস.সথ্যু ‘গরম হাওয়া’ বানিয়েছিল। এছাড়া এরকম আরও কিছু ছবি আমরা যারা দেখেছি তাদের কাছে ‘রাজকাহিনী’ একটা বড় জোক। ছবিটা দেশভাগ নিয়ে একটা কল্পলোক। বাস্তবের থেকে কয়েক বহু বহু ক্রোশ দূরের বস্তু। সে যাই হোক ভুলে ভরা ‘এক যে ছিল রাজা’র পুরস্কার পাওয়ার পেছনে এটা একটা বড় কারণ হল যে ছবিটা নির্বিষ এবং ক্লাসের ভাল ছেলে টাইপের। অযথা বিভিন্ন প্রশ্ন করে টিচারকে উত্যক্ত করেনা। আরেকটা কারণ হল যে বাংলা সিনেমার অবস্থা এতটাই খারাপ যে এছাড়া আর কোন ছবি এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিল সেটা ভাবতে বসলে আবার গভীর চিন্তায় পরতে হয়। ছবিটির ভুলগুলি নিয়ে সেই সময় আমি একটি লেখা লিখেছিলাম। ফলে এবার নতুন করে আর কিছু লিখছি না। শুধু একটা ব্যপার মনে পরল। সেটা হল ছবিতে রাজার সাথে রাজার বোনের একটা অপূর্ব সংলাপ দৃশ্য ছিল। ব্যপারটা ছিল এই রকম - ছবিতে রাজা মহেন্দ্র তার সমস্ত অতীত ভুলে গেছে এবং তার সাথে বাংলা ভাষাটাও সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। হিন্দি বলছে। অথচ বোন জয়ার সঙ্গে তার অত্যাশ্চর্য সংলাপ বিনিময় হচ্ছে, যেখানে জয়া ঢাকাইয়া বাঙাল ভাষায় কথা বলছে এবং সম্পূর্ণ বাংলা ভুলে যাওয়া যিশু সেটা বুঝে হিন্দিতে তার জবাব দিচ্ছে। আবার জয়াও সেই হিন্দি বুঝতে পারছে। তখন সিনেমার সাইলেন্ট পিরিয়ড। ফলে হিন্দি ছবি দেখেও জয়ার হিন্দি শেখার কোন উপায় ছিলনা। কীভাবে শিখল কেউ জানেনা। ছবিটা এরকম আরও বিভিন্ন মনি-মুক্তো খচিত। তবে একটা ছবি পুরস্কারটা পেতে পারত। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’। ছবিটা মুক্তি পায়নি। এছাড়া এই ছবিটিতে আমি সহকারী হিসেবে কাজ করেছি। ফালে ছবিটা নিয়ে আর কিছু বলছিনা। নিজেদের ছবি তো সবারই ভাল লাগে। কিন্তু এই ছবিকে বাদ দিয়ে আর কোন ছবির কথাই আমি মনে করতে পারছিনা যেটা এবছরের সেরা বাংলা ছবির পুরস্কার পাওয়ার দাবি রাখে। অনেকে কয়েকটা ছবির নাম বলছেন। তার মধ্যে কয়েকটা আমি দেখেছি। এই ছবিগুলি বিষয় বস্তুর দিক থেকে ‘এক যে ছিল রাজা’র থেকে আলাদা হলেও গুনোমানের দিক থেকে বিরাট কিছু ভাল বলে আমার মনে হয়নি। ভুলে ভরা সব ছবি। ফলে ‘বাদা বনে শিয়াল রাজা’। সৃজিত মুখার্জী অতীতেও একবার একটি মিরাকল ঘটিয়েছিলেন। ২০১৪-এ ‘চতুষ্কোণ’ ছবিটির জন্য উনি সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছিলেন যেবার তার কম্পিটিটার ছিলেন বিশাল ভরদ্বাজ। তার পরিচালিত অন্যতম সেরা ভারতীয় ছবি ‘হায়দার’ সেবারে মেজর কোন পুরস্কার পায়নি। আর ইন্দ্রদীপ দাসগুপ্তের ‘কেদারা’ ছবিটা নিয়ে আর কি বলব। কুড়ি মিনিট দেখেছি। সংলাপের মাধ্যমে গল্প বলার দুর্বল ও শিশুসুলভ প্রয়াস, অতীব কাঁচা ও অ-সিনেম্যাটিক সংলাপ লেখনী, সিনেমার ভাষা আর আঙ্গিকের প্রতি প্রায় কোন নজর নেই। ফলে তারপর আর দেখতে পারিনি। বুঝতে পারছিনা তার পরে এমন কি হল যাতে করে ছবিটা স্পেশাল জুড়ি পেলো। যদিও সান্ত্বনা পুরস্কার কিন্তু পেলো তো? কি আর করা যাবে। যেই সমাজে যোগ্যতা শেষ কথা বলেনা সেই সমাজে এরকম অনেক কিছুই হয়। প্রতি বছরই দেখি কিছু কিছু রাজ্যে সেই বছর তেমন কোন ভাল ছবি না হওয়ার কারণে (বা অন্য কোন কারণে) সে বছর সেই রাজ্যের কোন ছবিকেই সেরা ছবির পুরস্কার দেওয়া হয়না। যেমন এই বছর ওড়িশা, কাশ্মীর ইত্যাদি আরও কয়েকটা রাজ্যের কোন ছবিকে সেরা ছবির পুরস্কার দেওয়া হয়নি। বাংলা ছবির ক্ষত্রেও আমি এরকম হওয়ার দাবি জানিয়ে রাখলাম। দয়া করে আর ভুলভাল ছবিকে পুরস্কার দিয়ে গোটা বিশ্বের ভাল ছবি করিয়ে আর পণ্ডিত লোক জনের কাছে আমাদের ছোট করবেন না। তারা হাসে। আর আমাদের লজ্জা লাগে। একটা বাংলা ছবিও বিশ্বের প্রথম সারির কোন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলেক্ট হয়না। গঙ্গা পেরোয়নি। অথচ প্রায় প্রতি বছরই এর মধ্যে থেকে কিছু ছবি জাতীয় পুরস্কার পেয়ে কলার উঁচু করে রাজ্যের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। আর পারা যাচ্ছেনা।


পড়ুনঃ


কিছু যোগ্য ছবি যে পুরস্কার পাচ্ছে সেই কথা আমি আগেই বলেছি। ‘বাধাই হো’ পেয়েছে, ‘অন্ধাধুন’ পেয়েছে। ফলে দয়া করে আর ‘নিউটন’, ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘কোর্ট’ এইসব ছবিগুলির উদাহরণ দেবেন না। কারণ এটা আমাদের মনে রাখতে হবে নব্বই জনের ভাত মারতে গেলে দশ জনকে ভাত দিতে হয়। ফলে যখনই ভাত মারা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তখনই দশ জনকে সামনে নিয়ে আসা হয়। বলা হয় ‘কে বলেছে ভাত মারা হচ্ছে। এইতো এরা পাচ্ছে। বল পাচ্ছিস না?’ হ্যাঁ বাবু পাচ্ছি। কিন্তু আমার আর হজম হচ্ছেনা। এদেশে সিনেমার কোন ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিনা। ভাল সিনেমার কণ্ঠরোধ করার একটা ফ্যাসিস্ট প্রক্রিয়া ক্রমশ ঘাড়ে চেপে বসছে। টিভিতে রাত দিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই দেশপ্রেমের ছবি দেখানো হচ্ছে। সেন্সর বোর্ডের আধিকারিকরা ধারালো কাঁচি নিয়ে বাঘের মত বসে আছে। মর্জিমাফিক জিনিস না হলেই ঘ্যাঁচ করে কেটে দিচ্ছে। এসব দেখে একজন সিনেমা কর্মী ও সিনেমার ছাত্র হিসেবে খুবই হতাশ লাগছে। আমার ধারনা অনেকেরই লাগছে। কম বয়েসী ইমোশনাল সিনেমার ছাত্র-ছাত্রীদের তো আরও খারাপ লাগছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভরসা যোগায়। একদিন আসবে যেদিন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সিনেমা বলে উঠবে-

“হারে রে রে রে রে, আমায় রাখবে ধ'রে কে রে--

দাবানলের নাচন যেমন সকল কানন ঘেরে,

বজ্র যেমন বেগে গর্জে ঝড়ের মেঘে,

অট্টহাস্যে সকল বিঘ্ন-বাধার বক্ষ চেরে॥

হারে রে রে রে রে, আমায় ছেড়ে দে রে, দে রে--”

261 views
  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

Get Blogtog updates on the go

We dont Spam or play with your data

©2019 by Blogtog.