• Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

Get Blogtog updates on the go

We dont Spam or play with your data

©2019 by Blogtog.

  • Blogtog

নিজেকে আয়নায় প্রথমবার দেখে আঁতকে ওঠা থেকে অ্যাসিড দগ্ধ মহিলাদের জন্যে NGO- লক্ষ্মীর লড়াই


দিল্লীর এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোরী, সদ্য ফোঁটা এক কুঁড়ি যা আস্তে আস্তে ফুটে ওঠার প্রচেষ্টায় ছিল।


ছিল বললাম ,তার কারণ ফুটে ওঠবার আগেই তাকে ওই গাছের ডাল থেকে উপড়ে ফেলা হয়। কিন্তু উপড়তে পেরেছে কি?

ভাবছেন কার কথা বলছি? হ্যাঁ তাকে হয়তো সেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে খুঁজে পাবেন না, কিন্তু মনের ভিতরে একবার শুধু উঁকি দিয়ে দেখুন,নিজেকে তার মাধ্যমে ঠিক খুঁজে পাবেন। এতক্ষন ধরে যার কথা বললাম তার নাম লক্ষ্মী, লক্ষ্মী অগ্রবাল। বয়স যখন বছর পনেরো, তখন নাইম খান নামের এক লোক তার বাড়িতে তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। স্বাভাবিক ভাবেই বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে দেয় লক্ষ্মীর পরিবার কারণ তারা হিন্দু। লক্ষী নিজেও সেই লোকটিকে পছন্দ করতো না, নাইম খানের বয়সও ছিল তার দ্বিগুনেরও বেশি!


পুলিশে জানিয়েও তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছিল না। লক্ষী তখন স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি দিল্লির খান মার্কেটে একটা বইয়ের দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করতো। ২০০৫ সালের কথা । এক সকালে বাড়ি থেকে হেঁটে খান মার্কেটের দিকে যাচ্ছিল লক্ষী, দোকানের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, এমন সময় রাস্তার উল্টোপাশ থেকে নাইম খানকে আসতে দেখলো সে। সঙ্গে ছিল আরও দুজন। অন্যদিকে তাকিয়ে হেঁটে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলো লক্ষী, কিন্ত সে জানতো না, নাইম সেদিন খালি হাতে আসেনি। ছোট একটা বিয়ারের বোতলকে নিজের দিকে উড়ে আসতে দেখলো লক্ষী, হাত বাড়িয়ে সেটা ঠেকানোর চেষ্টা করলো সে।


পড়ুনঃ

৬৫% মেয়েরা তাদের বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই body shaming এর শিকার হয়


এরপর কয়েক মুহূর্তে লক্ষ্মীর উপরে যেন নরক নেমে এলো। বিয়ারের বোতলটা ছিল অ্যাসিডভর্তি, সেই তরলটা আঘাত করলো লক্ষীর মুখে, হাতে। রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে চিৎকার করতে থাকলো মেয়েটা, আশেপাশের মানুষগুলো তখন হতভম্ভ হয়ে তাকে দেখছে! প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে এক ট্যাক্সিওয়ালা পাঁজাকোলা করে তাকে গাড়িতে ওঠালো, নিয়ে গেল হাসপাতালে। যমে মানুষে টানাটানি শুরু হলো, ডাক্তারদের হার না মানা মানসিকতা লক্ষীকে ফিরিয়ে আনলো মৃত্যুর মুখ থেকে। তবে সুন্দর মুখটাতে চিরদিনের জন্যে একটা দাগ বসে গেল তার।


লক্ষ্মী প্রাণে বেঁচে গেলো কিন্তু ওর কেবিনে কোনও আয়না রাখা হোল না, ঝলসে বদলে যাওয়া চেহারাটা পাছে মেয়েটা দেখে সহ্য করতে না পারে সেই ভয়ে। একজন নার্স সকালে একটা গামলায় জল নিয়ে আসতো লক্ষীর মুখ পরিস্কার করে দিতে- সেই জলের দিকে তাকিয়ে ব্যান্ডেজে ঢাকা বিকৃত চেহারাটার প্রতিচ্ছবি দেখে আঁতকে উঠতো লক্ষী। গায়ে অ্যাসিড পড়ার সেই মূহুর্তটার কথা পরে বলেছিল লক্ষী- ‘মনে হচ্ছিল, কেউ বুঝি আমার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে! এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা এর আগে কখনও পাইনি আমি। আমার হাত আর মুখ তখন শরীর থেকে আলাদা করে ফেললেও বোধহয় এতটা ব্যাথা পেতাম না আমি!' শরীরের সাথে সাথে দগ্ধ হয়েছে ওর আত্মাও। শরীরের ক্ষতিতে প্রলেপ লাগলেও, মনের ওই চির ক্ষতের উপরে কোনও প্রলেপই কাজ করে না। কিন্তু লক্ষ্মীর অসীম সাহস ওকে জীবনের এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছে দিলো। যেখানে ভারত বা বাংলাদেশের হাজার হাজার অ্যাসিডদগ্ধ নারী বাকিটা জীবন ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে কাটিয়ে দেয় সেখানে লক্ষ্মী বাঁচবে বাঁচার মতো করে, কারো করুণার পাত্রী হয়ে নয়। ২০০৬ সালে হাইকোর্টে একটা পিআইএল দাখিল করলো সে, বেআইনীভাবে খোলা বাজারে অ্যাসিঁড বিক্রি বন্ধের দাবীতে। দীর্ঘ সাত বছর পর অর্থাৎ ২০১৩ সালে আদালত রায় দিলো, কোম্পানীর লাইসেন্স ছাড়া অ্যাসিড কেনাবেচা করা যাবে না, পুরো ব্যাপারটাতে সরকারের নজরদারী থাকতে হবে।


পড়ুনঃ

সত্যজিতের মতে হলিউডে অভিনয় করলে নির্দ্বিধায় অস্কার পেতেন-ট্রাজেডিক আর বিস্মৃত নায়ক তুলসী চক্রবর্তী


এরইমধ্যে নিজের লেখাপড়া শেষ করেছেন ,একটি NGO খুলেছেন অ্যাসিড দগ্ধ মহিলাদের সাহায্য করবার জন্য। ঘরে ঘরে গিয়ে সতর্ক করে এসেছেন, পথসভা করেছেন। অনলাইন পিটিশন চালিয়েছেন, এরও আগে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের স্বাক্ষর নিয়েছেন পিটিশনের জন্যে অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করিয়েছেন তরুণদের। ভারতে অ্যাসিডের আঘাতে ঝলসে যাওয়া নারীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন তিনি। ২০১৯ এ পেয়েছেন "ওমান এম্পওেরমেনট এওয়ার্ড”, এর আগে ২০১৪ তে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা লক্ষীকে পুরস্কৃত করেছেন তার সাহসিকতা এবং পরিশ্রমের জন্যে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন লক্ষী, ভারত সরকারও যথাসাধ্য সাহায্য করেছে তাকে। লক্ষীর ওপরে যে লোক অ্যাসিড হামলা করেছিল, আদালতে বিচার হয়েছে তারও।


অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়েই পরিচয় হয়েছিল অলোক দীক্ষিত নামের এক তরুণের সঙ্গে, বন্ধুত্ব থেকে বিয়ে তারপর একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জননী নাম পিহু। অলক এবং লক্ষ্মী কখনো বিয়ে করেননি কারণ ওই প্রথার মধ্যে দিয়ে তাঁরা যেতে চাননি। যদিও সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, ২০১৫ তে তাঁরা আলাদা হয়ে যান। মেয়ে পিহুকে নিয়ে একা লড়াই করে চলেছেন লক্ষ্মী। অনেকেই চাকরি দিতে চেয়েছিল কিন্তু তাঁর আত্মসম্মান তাঁকে সেটা করতে দেয়নি। চেয়েছিলেন সরকারী একটি চাকরি। পরে একটা টিভি চ্যানেলের উপস্থাপিকা হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। তাঁকে নিয়ে তৈরী হচ্ছে সিনেমাও আজ ২০২০ তে রিলিস করবে।





সব শেষে এটাই বলতে চাই আজ ঘরে ঘরে এরকম লক্ষ্মী জন্মাক, সমাজের সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলুক, হয়ে উঠুক প্রত্যেকটা ঘরের চেনা মুখ। তাই তো প্রথমেই বলেছিলাম মনের ভিতরে একবার শুধু উঁকি দিয়ে দেখুন,নিজেকে ঠিক খুঁজে পাবেন লক্ষ্মীর মাধ্যমে।


পড়ুনঃ

ভিউ বাড়ানোর দৌড়ে, মানুষের রুচি নষ্ট করে ফেলছে নিউজপোর্টালরা


Read more from this writer