• Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

Get Blogtog updates on the go

We dont Spam or play with your data

©2019 by Blogtog.

  • Blogtog

৬৮র বন্যার পর এখনো কি উত্তরবঙ্গ নিরাপদ?


১৯৬৮ সালের ২রা অক্টোবর । ধীর পায়ে হেঁটে বাড়ী ফিরছে আজমল । কয়েকদিন ধরে যেরকম বৃষ্টি চলছে এরকম বৃষ্টি আগে কখনো সে দেখেছে কিনা তা মনে পড়ে না। ছোটবেলায় বাবা একবার বলেছিল মেঘ ভাঙা বৃষ্টির কথা । এটাই কী সেই বৃষ্টি , বুঝতে পারেনা সে । ছাতা দিয়েও এই বৃষ্টি মানছে না , হাতে ধরা ব্যাগটি ভিজে চপচপ করছে । পাশের বাড়ীর স্বপন দা তিনটে নারকোল চেয়েছিল , ওদের বাড়ী পরশু পুজো আছে ।


স্বপন দার বাড়ীর সামনে এসে আজমল জানতে পারলো তিনি ময়নাগুড়ি চলে গেছেন জরুরী কাজে । তিস্তার জল নাকি খুব বেড়ে গেছে এই বৃষ্টিতে , সর্বত্র লাল সতর্কতা জারি করার পরিস্থিতি হয়েছে । আজমল জানে স্বপন দা জল বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার । তার মনের মধ্যে একটা ভয়ের উদ্রেক হলো নিজের পরিবার ও পাড়ার সকল মানুষজন আত্মীয় স্বজন দের নিয়ে ।


সেই দুর্যোগের রাত কেটে সকাল হলো । কিন্তু নতুন করে বিপদের মুখে পড়লো রমেন ঘোষ ও তার পরিবার । সকাল থেকে অঝোর বৃষ্টি পড়ছে , এর মধ্যেই রমেন বাবুর মা বাথরুমে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারালেন । অনেক দেরিতে এম্বুলেন্স এলেও জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় রীতা দেবীকে । তবে বাড়ির লোক একজন সবসময় থাকতে হবে হাসপাতালে ।


পড়ুনঃ আর কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতার অবস্থাও হবে চেন্নাইয়ের মতন


৪ঠা অক্টোবর ১৯৬৮ র সন্ধ্যের বৃষ্টির মধ্যেই সকল ব্যস্ততা সেরে কোজাগরী লক্ষীপুজো সেরে উঠলেন অনিমা মজুমদার । তার তিন বছরের ছেলে রাহুলের চঞ্চলতা সেদিনের মতো খানিকটা বন্ধ কারণ মায়ের সাবধানবাণী তার স্মরণে আছে । বেশি দুষ্টামি করলে নাড়ু দেওয়া হবে না তাকে । কিন্তু রাহুলের নাড়ু বড্ড প্রিয় । বাবা থাকলে সে নাহয় মনে বল পেতো কিন্তু স্বপন বাবু এখন দোমহনী তে আছেন । সমগ্র জলপাইগুড়ি তে বন্যার আশঙ্কা । তবে রাহুলের কোনো ভয় নেই । আর পাশের বাড়ীর বন্ধু ফিরোজ ( আজমলের ছেলে ) একটু বাদেই চলে আসবে । দুই বন্ধু মিলে বেশ জমিয়ে নাড়ু খাওয়ার ইচ্ছে আছে রাহুলের ।


পৃথিবীতে সব ইচ্ছে সবসময় পূরণ হয় না , কারন সেই কোজাগরী রাতটি জলপাইগুড়ি শহরের মানুষের কাছে বিভীষিকার রাত ছিল । ৪ অক্টোবর ১৯৬৮-র গভীর রাতে তিস্তা নদী হঠাৎ শহরের ভিতর ঢুকে পড়ে। পঞ্চাশ বছর আগে যাঁরা ওই দুর্যোগ প্রত্যক্ষ করেছিলেন বা তার গ্রাসে পড়েছিলেন তাঁরা মন থেকে এই দিনটি মুছে ফেলতে পারেননি। এই বন্যা এত আকস্মিক ছিল যে বহু লোক প্রস্তুত হওয়ার কোনও সময় পাননি। ৩ অক্টোবর সন্ধ্যা ছ’টার সময়েই খবর এসেছিল তিস্তাবাজারে অ্যান্ডারসন ব্রিজে জল বিপদসীমার ২০ মিটার উপরে উঠে গিয়েছে। এটাও অনুমান করা গিয়েছিল যে রাত দুটো নাগাদ বন্যার জল জলপাইগুড়ি শহরের কাছে এসে পৌঁছবে। কিন্তু প্রশাসন থেকে কোনও সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশিকা জারি করা হয়নি। এর দু’টি কারণ থাকতে পারে: ১) এটা প্রশাসনের দিক থেকে একটি ত্রুটি, ২) প্রশাসন এবং জলপাইগুড়ির সাধারণ মানুষ ভাবতে পারেনি শহরকে রক্ষা করার জন্য যে তিন মিটার উঁচু বাঁধ আছে তা ছাপিয়ে জল শহরে প্রবেশ করতে পারে।


পড়ুনঃ বৃষ্টি এখন মানুষের হাতে- চিনের স্কাই রিভার প্রজেক্টে পরীক্ষা চলছে কৃত্রিম বৃষ্টির


এই বন্যায় জলপাইগুড়ি শহরে ২১৬ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে, ৩৪৫৬টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৩৭০টি গরু মারা যায়। শহরের ভিতরে জলস্রোত ছিল প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার। তিস্তায় সে দিন জলপ্রবাহের পরিমাণ ছিল ১৯৮০০ কিউসেক  (ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ডে)। জলপাইগুড়ির তিস্তা ব্রিজ এমন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে ডুয়ার্সের সঙ্গে জলপাইগুড়ির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অ্যান্ডারসন ব্রিজের মতো অনুপম স্থাপত্যের নিদর্শনটিও এই বন্যায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। করলা নদীর বাঁ দিকের অংশের সঙ্গে ডান দিকের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বাঁ দিকের বন্যা কবলিত মানুষ রিলিফ পেয়েছেন অনেক দেরিতে । বন্যা কবলিত মানুষের আশ্রয়স্থান হয়ে উঠেছিল আনন্দচন্দ্র কলেজ ও এল.আই.সি বিল্ডিং ।


সে সময় জলপাইগুড়ি শহর অনেক ছোট, অধিকাংশ বাড়িই একতলা, টিনের চাল। শহরে বন্যার জল প্রবেশ করে রাত দুটো নাগাদ প্রথমে করলা নদী দিয়ে। তখন করলার মোহানা ছিল কিং সাহেবের ঘাটের কাছে। সেখানে বাঁধ থাকায় জল ঢুকতে একটু সময় নেয়। করলা নদীর উপর যে ক’টি ব্রিজ ছিল, একটি বাদে সব ক’টি ভেঙে যায়। ফলে করলার পূর্ব দিকের অংশ পশ্চিম দিকের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সঙ্গে রংধামালীর দিক থেকে তিস্তার জল প্রবল বেগে ঢুকতে থাকে। সারা শহর দুই থেকে সাড়ে চার মিটার জলের তলায় চলে যায়। অনেক নিচু জায়গায় জলের গভীরতা আরও বেশি ছিল। শুনেছি জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালের একতলাটি সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছিল, অধিকাংশ রোগীকেই বাঁচানো যায়নি। জেলখানার একটি দেওয়াল ভেঙে যায় ।


পড়ুনঃ টাকির পার্থ মুখার্জি- ভাঙা কলের মুখে কল লাগাচ্ছেন, দল নিয়ে গাছ কাঁটা আটকাচ্ছেন


উপরের চরিত্রদের মধ্যে আজকে কেউ বেঁচে নেই । একটি বন্যা কতটা সর্বগ্রাসী হতে পারে তা তখনকার দিনে মানুষের সাথে কথা বললে জানা যায়। সব হারানোর যন্ত্রনা কাকে বলে তা বুঝলাম শঙ্কর জেঠুর চোখের জল দেখে । তবু কতটা নিরাপদ আমরা ? বর্তমানে তিস্তার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, তার উচ্চ অববাহিকায় ক্রমাগত নির্মাণকাজ হচ্ছে। বিপুল পরিমাণে বনভূমি নষ্ট হয়েছে রাস্তা প্রসারিত করার জন্য। তার উপরে তিস্তার বুকে বেশ কয়েকটি ব্যারেজ ও জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। সিকিম ও দার্জিলিং হিমালয়ের অন্তর্ভুক্ত তিস্তার উচ্চ অববাহিকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এই এলাকায় প্রতিটি জলাধারই ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে ধস নামার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই আবার যদি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটে তবে প্রাকৃতিক জলাশয় এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারগুলি যে সেই জল ধরে রাখতে সক্ষম হবে না, তেমন আশঙ্কা বিলক্ষণ।


তথ্য সূত্র : ১. প্রত্যক্ষ যারা দেখেছিল তাদের বিবরণ

২. আনন্দবাজার পত্রিকা

63 views