• Blogtog

ঠাকুর বংশের ইতিহাস


সনৎ কুমার বসু


[শ্রদ্ধেয় প্রশান্ত কুমার পালের "রবিজীবনী"-

কবিগুরুর জীবনী -বিষয়ক আকর গ্রন্থগুলির অন্যতম।তাঁর সেই রচনা থেকে সংগৃহীত সংক্ষিপ্ত নির্যাস ধারাবাহিক ভাবে ব্লগটগে প্রকাশের আয়োজন করা হল।প্রশ্ন উঠবে মূল পুস্তক সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও এর সংক্ষিপ্ত নির্যাসের প্রয়োজন হল কেন? আসলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত,সময়াভাব এবং অন্যান্য বহুবিধ কারণে দীর্ঘপাঠে অনেকক্ষেত্রে পাঠকের অনীহা পরিলক্ষিত হয়।অথচ এমন একটু মূল্যবান পুস্তক-পাঠের প্রয়োজনীয়তা বাঙালি জীবনের একটি অপরিহার্য কর্মপথ বলে আমাদের বদ্ধমূল ধারণা।

তাই এই সংক্ষিপ্ত নির্যাস যদি পাঠক কূলকে আকর্ষণ করে তবেই এই সংকলনের সার্থকতা প্রতীয়মান হবে।এ ছাড়াও বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে মূল পুস্তকের সুলভ প্রাপ্তির সুযোগ তো বহাল রইলই।


এই রচনাতে শ্রদ্ধেয় প্রশান্ত কুমার পালের মূল রচনার লিখিত পাঠের সকল তথ্যাদি এবং বানান-বিধি সম্পূর্ণভাবে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।


আমরা শ্রদ্ধেয় প্রশান্ত কুমার পালের পরিবার ও পরিজনের কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম।


শুভাঞ্জন বসু

সম্পাদক]





জীবনের চলার পথের বন্ধুরতায় বারবার হোঁচট খেতে খেতে উঠে দাঁড়িয়ে মনুষ্যত্ব অন্বেষণের সঠিক দিশা খুঁজে পেতে যাদের মূল্যবান জীবন ও জীবনী আমাদের আলোর দিশারী,তাদেরই অন্যতম হলেন রবীন্দ্রনাথ।তাই তাঁর জীবনের নির্যাস আত্মস্থ করতে "রবিজীবনী" পাঠ এক অত্যাবশ্যকীয় কর্মপথ।তাই এই রচনা সংকলনে ব্রতী হতে হল।


‌আর্য সংস্কৃতি,যাকে আমরা ভারতীয় সভ্যতার প্রধান ভিত্তি বলে বিশ্বাস করি তার প্রভাব বাংলাদেশে স্পর্শ পেয়েছিল অনেক পরে। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দীর বেশির ভাগ সময়েও বাংলাদেশে ব্রাহ্মন্য আচার অনুষ্ঠানের চেয়েও বৌদ্ধ প্রভাব বেশি লক্ষিত হয়েছিল। সেই কারণেই নাকি মহারাজ আদিশুর বাংলাদেশে বেদবিহিত যজ্ঞাদি প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে কনৌজ বা কান্যকুব্জ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে আনিয়েছিলেন।আধুনিক বাঙালি ব্রাহ্মণদের আদিপুরুষ নাকি এই পঞ্চব্রাহ্মণ।ঐতিহাসিকেরা অবশ্য আদিশুরের অস্তিত্ব সম্পর্কেই সন্দিহান।তাদের নাম নিয়েও মতভেদ আছে, তবে শান্ডিল্য -গোত্রীয় ভট্ট নারায়ণ থেকেই ঠাকুর গোষ্ঠীর উদ্ভব,এমন একটা মত বহুল প্রচারিত।- তাদের কৌলিক পদবী নাকি বন্দ্যোপাধ্যায়।

যাই হোক ইতিহাস অনুসরণে দেখা যায় খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলমান আক্রমণের পরবর্তীকালে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় আলোড়ন ঘটে যায়।কোথাও মুসলমান শাসকদের অত্যাচারে,কোথাও বা তাঁদের সংস্পর্শের কারণেই বহু উচ্চশ্রেণীর হিন্দু বিশেষত ব্রাহ্মণ,সামাজিক দিক দিয়ে অখ্যাতি লাভ করেন।রবীন্দ্রনাথের আদিপুরুষেরা এভাবেই ব্রাহ্মন সমাজে একটি বিশিষ্ট " থাক" ভুক্ত হয়েছিলেন,যার নাম "পিরালি থাক"।ব্যোমকেশ মুস্তাফির বিবরণ অনুযায়ী যশোহর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার জমিদার গুড়-বংশীয় দক্ষিনানাথ রায়চৌধুরীর চার পুত্র- কামদেব,জয়দেব,রতিদেব ও শুকদেবের মধ্যে প্রথম দুজন মামুদ তাহির বা পীর আলি নামক এক স্থানীয় শাসকের চক্রান্তে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং তাদের সংস্পর্শে থাকা অপর দুই ভাই রতিদেব ও শুকদেব সমাজচ্যুত হয়ে পিরালি(বা পীরালি) থাকের অন্তর্ভুক্ত হন।


এই সমাজ চ্যুতির ফলে স্বশ্রেণীর ব্রাহ্মণদের সঙ্গে পিরালিদের বিবাহ ইত্যাদি সামাজিক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়।ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা পুত্র-কন্যাদের বিবাহে কৌশল এবং প্রলোভনের জাল ছড়াতে থাকেন।দুই ভাই -এর অন্যতম শুকদেবের কন্যাকে বিবাহ করেন পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী।এই অপরাধে জগন্নাথ আত্মীয়দের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে শুকদেবের আশ্রয়ে বারোপাড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন।এই জগন্নাথ কুশারীই ঠাকুর- বংশের আদিপুরুষ।জগন্নাথের চারপুত্র- প্রিয়ঙ্কর, পুরুষোত্তম, হৃষীকেশ ও মনোহর।রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ প্রত্যহ যে মন্ত্রটি আবৃত্তি করে পিতৃ পুরুষদের স্মরণ করতেন তার আদিতে ছিল জগন্নাথ কুশরীর মধ্যম পুত্র পুরুষোত্তমের নাম-


পুরুষোত্তমাদ্বল রামঃ বলরামাদ্ধরি হরঃ

হরিহরাদ্রামা নন্দঃ রামানন্দাল্মহেশঃ

মহেশাৎ পঞ্চাননঃ পঞ্চাননাজ্জয়রামঃ

জয় রামান্নীলমনিঃ নীলমর্নেরাম লোচনঃ

রামলোচননাদ্দারকা নাথঃ নমঃ পিতৃপুরুষেভ‍্যো নমঃ পিতৃপুরুষেভ‍্যো।


পুরুষোত্তমের প্রপৌত্র রামানন্দের দুই পুত্র মহেশ্বর ও শুকদেব।শোনা যায় মহেশ্বর বা তাঁর পুত্র পঞ্চানন জ্ঞাতিকলহে দেশত্যাগ করে ভাগ্য অন্বেষণে কলকাতায় উপস্থিত হন।সময়টা জোব চার্নকের কলকাতা পত্তনের সম সাময়িক অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ।এর অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চল ব্যাবসা-বাণিজ্যে প্রাধান্য লাভ করেছিল।পর্তুগিজ, ডাচ প্রভৃতি বিদেশী বণিকদের আসা যাওয়া, বড় বাজারের কাছে শেঠ- বসাকদের সূতাবস্ত্রের হাট বহু লোককে এই অঞ্চলের দিকে আকর্ষণ করত।সেই আকর্ষণেই পঞ্চানন ও কাকা শুকদেব কলকাতা গ্রামের দক্ষিণে গোবিন্দপুরে আদি গঙ্গারতীরে বসতি স্থাপন করেন।সেখানে তখন মৎস্য-ব্যবসায়ী জেলে, মালো, কৈবর্ত প্রভৃতি জাতির বাস।সেখানকার বণিক-বৃত্তিধারী পোদ -রা আগ্রহভরে তাদের সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিল।বিদেশী যেসব জাহাজ এখানে আসত, পঞ্চানন,শুকদেব প্রথমে সেইসব জাহাজে মাল সরবরাহের কাজ শুরু করে বেশ কিছু অর্থের অধিকারী হলে গোবিন্দপুরে গঙ্গাতীরে জমি কিনে বসতবাটি নির্মাণ ও শিব প্রতিষ্ঠা করেন।এই সময়ে ঘটনাচক্রে তাঁদের পদবীরও পরিবর্তন ঘটে।নিম্নশ্রেণীর প্রতিবেশীদের কাছে তাঁরা "ঠাকুরমশাই" অভিধায় সম্বোধিত হতেন।তাদের দেখাদেখি সাহেবরাও তাঁদের ঠাকুর(Taguore,Tagoor,Tagore) বলতে শুরু করেন।এভাবেই পঞ্চানন "কুশারী" হয়ে পড়েন পঞ্চানন "ঠাকুর"।এই পঞ্চানন থেকেই কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা,জোড়াসাঁকো ও কয়লাঘাটার ঠাকুর গোষ্ঠীর উৎপত্তি।এবং শুকদেব থেকে চোরাবাগানের ঠাকুর গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে।



পঞ্চানন ঠাকুরের দুই পুত্র জয়রাম ও রামসন্তোষের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের মেলামেশা থাকায় তাঁরা কিছু কিছু ইংরেজি জানতেন, তা ছাড়া ফারসি ভাষায়ও ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তখন পঞ্চাননের চেষ্টায় জয়রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পে - মাস্টারের অধীনে প্রধান কর্মচারী নিযুক্ত হন। কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর ইংরেজদের অধীনে আসার পর ১৭০৭ (১১১৪)-এ এই অঞ্চলে প্রথম জরিপ কাজ শুরু হয়।

তখন রালফ্ সেল্ ডন ছিলেন কালেক্টর। এই কাজে দুজন আমীনের প্রয়োজন হলে পঞ্চাননের অনুরোধে সেল্ ডন, জয়রাম ও রামসন্তোষকে এই পদে নিযুক্ত করেন। জয়রাম পে- মাস্টারের অধীনের কাজটিও বহাল রাখেন। এই ভাবে তারা ধীরে ধীরে বিত্তশালী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ক্রীত জমিগুলো তারাই জরিপ করেন।

এই সূত্রে প্রতিবেশী গ্রামগুলির অধিকাংশ ভূ ভাগের মালিক নবদ্বীপাধিপতি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে জয়রামের ঘনিষ্ঠতা জন্মায়। জয়রাম যখন নিজগৃহে "রাধকান্ত" নামে বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেন, তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র দেবসেবার জন্য নিজের জমিদারির মধ্যে ৩৩১ বিঘা নিষ্কর জমি তাঁদের দান করেন।

এর থেকে বোঝা যায়, নতুন পদবী-প্রাপ্ত পতিত পিরালি ব্রাহ্মন ঠাকুরগোষ্ঠী ধনসম্পদ ও মান মর্যাদার দিক থেকে কলকাতার নতুন সমাজে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে থাকেন।

জয়রামের দুইস্ত্রী- গঙ্গা ও রামধনি। রামসন্তোষের স্ত্রী সিদ্ধেশ্বরী। জয়রামের চারটি পুত্র - আনন্দীরাম, নীলমণি, দর্পনারায়ণ, গোবিন্দরাম।

১৭৫৬(১১৬২) - এ জয়রামের মৃত্যু হয়। ব্যোমকেশ মুস্তাফি লিখেছেন, " জয়রাম ও রামসন্তোষ আমীনীকার্য্যে বিলক্ষণ দশটাকা উপার্জন করিয়া ধনসায়র (বর্তমানে ধর্মতলা) নামক স্থানে বাড়ী, বৈঠকখানা, জমাজমী এবং এখন যেখানে ফোর্ট উইলিয়ামের পুরোনো কেল্লা, যা বর্তমানে ডালহৌসির জি.পি.ওর কাছে অবস্থিত ছিল সেটি জুন ১৭৫৬ - এ নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে তা ধ্বংস করেন।

এই সময় ঠাকুর পরিবারকে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।এরপর ২৩জুন ১৭৫৭ পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের হাতে নবাবের পরাজয় ঘটলে মীরজাফর নবাব হন এবং কলকাতা জয়ের ক্ষতিপূরণ স্বরূপে যে টাকা দেন ইংরেজ কোম্পানিকে, জয়রামের পুত্র নীলমণি তার থেকে ১৮ হাজার টাকা পান।

নীলমণি বাসস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজনে ডিহি কলকাতা গ্রামে জমি কিনে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ২০ শে পৌষ ১১৭১(পয়লা জানুয়ারি ১৭৬৫) তারিখে কালেক্টরির নিজ অধিকারভুক্ত জমি থেকে দু বিঘা তেরো কাঠা জমি বার্ষিক ৭৸৶৪ গন্ডা সিক্কামুদ্রা খাজনায় বসবাসের জন্য পাট্টা করে নেন। এই জমিরই পার্শ্ববর্তী ঘরবাড়ি সমেত সাড়ে দশ কাঠা জমি জনৈক রামচন্দ্র কলুর কাছ থেকে ৫২৫ টাকায় ক্রয় করেন ১৬ই চৈত্র ১১৭১সালে।এইভাবে ১১৭১ বঙ্গাব্দের শেষ দিকে(১৭৬৫) পাথুরিয়া ঘাটায় ঠাকুর - পরিবারের বসবাসের সূত্রপাত।

কয়েক বছর পরে ২৫ অগ্রহায়ণ ১১৭৬(ডিসেম্বর ১৭৬৯) এইসব জমিরই সংলগ্ন চুঁচুড়া-বাসী জগমোহন দাস(সাহা) - এর ঘরবাড়ি সমেত দুবিঘা সাত কাঠা জমি ৯০০০ টাকায় ক্রয় করেন।সব-কটিরই দলিল নীলমণি ঠাকুরের নামে ছিল।

এইসব ঘটনার সময় বা তার কিছু আগে থেকেই নীলমণি ঠাকুর কোম্পানীর অধীনে চাকুরী গ্রহণ করেন। ১১৭২(বাং) - এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা - বিহার - উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করার পর নীলমণি উড়িষ্যার কালেক্টরের সেরেস্তাদার হয়ে উড়িষ্যায় যান এবং সেখান থেকে রোজগারের টাকা ভ্রাতা দর্পনারায়নের

কাছে পাঠাতে থাকেন।

দর্পনারায়নও হুইলারের দেওয়ান ,নিমক ও বাজারের ইজারাদার, জমিদারির পত্তনিদার রূপে এবং অন্যান্য ব্যবসার সূত্রে বিরাট ধনসম্পদের অধিকারী হন। ব্যবসা- বাণিজ্যের দ্বারা আর্থিক উন্নতিতে দর্পনারায়ন ও তাঁর পুত্রেরা তুলনামূলক ভাবে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁদের উদ্যমও ছিল বেশি।





(... ক্রমশ)

73 views
  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.