• Blogtog

পুজোর প্যাঁচে হাঁদা-ভোদা । শুভাঞ্জন বসু

শুভাঞ্জন বসু


বাঙালি শান্তিপ্রিয় জাতি, একথা তো প্রায় আমরা সকলেই জানি মানি। কিন্তু বাঙালির মধ্যে কেউ কেউ যে একসময় ঠগী ছিল, ডাকাত ছিল তা বোঝা যায় পুজোর চাঁদা তোলার সময়। সে এক রমরমা ব্যাপার। হইহই রৈরৈ। রাস্তাঘাটে যেখানে দেখবে সেখানেই রে রে রে রে করে তেড়ে আসে পাড়ার ক্লাবের মেম্বাররা। সারগামাতে যে আরো ছ খানা সুর আছে, তা যেন কারোর মাথাতেই নেই। শুধু 'রে'।


এই নিয়ে হাঁদাও ভীষণ চিন্তায়। কী ভাবে আটকানো যায়। ভোঁদাকে বলেছিল একটা কিছু আইডিয়া দিতে কিন্তু দশমীর পর বিজয়া আর তারপর লক্ষী পুজো। ভোঁদার পেট পুজো শেষই হচ্ছে না যেন। দুর্গাপূজায় যাও বা একটু আটকানো গেছে, কালীপূজায় তো কোনো সম্ভবনাই নেই। চারিদিকে পোস্টার পরে গেছে, সবচেয়ে বড় কালী প্রতিমা এবার হচ্ছে হাঁদা-ভোঁদাদের পাড়ায়। দাদারা অলরেডি একবার এসে ১০০০ টাকার চাঁদা কেটে গেছে। টাকা যদিও দেয়নি, কিন্তু রাস্তা ঘাটে দেখা হলেই চেপে ধরছে। কী করা যায় কিচ্ছু মাথায় আসছে না হাঁদার। মাসি, মেসো, পিসি, পিসোর কাছ থেকে প্রণাম টনাম করে এবছর মাত্র ৭০০ টাকা কামাই হয়েছে। আর পুজো শেষ মানে তো টাকা কামাইয়ের রাস্তাও বন্ধ। মামা কবে বিলেত থেকে ফিরবে কে জানে? নারায়ণ কাকু মারা যাওয়ার পর থেকে রয়ালিটির টাকাও আসছে না আর হাতে। এই অবস্থায় যদি পুজোর চাঁদা দিতে হয় তাহলে তো সাড়ে সর্বনাশ।


'এই কবে টাকাটা দিবি বলতো?' - চমকে উঠলো হাঁদা। মন দিয়ে হিসাব নিকাশ করতে করতে হাটছিল, খেয়ালই করেনি কখন ক্লাবের সামনে এসে পড়েছে। মিন্টু দা পাকড়াও করেছে এবার। আর বাঁচার উপায় নেই। হাঁদা একটু ভেবে বুদ্ধি পেল একটা। মাথা চুলকে বললো - 'চাঁদা তো আমি পাঠিয়ে দিয়েছি।'

মিন্টুদা জিজ্ঞাসা করলো - 'কাকে?'

-'ভোঁদার হাতে। ও এসে দিয়ে যাবে আজকের মধ্যেই'।

'ভোঁদার হাতে?'- মিন্টুদা অবিশ্বাসের চোখে তাকালো হাঁদার দিকে। হাঁদা একটু ঘাবড়ে গেলেও হাসি হাসি মুখে হ্যাঁ জানালো। মিন্টুদা হঠাৎ হাঁদার ঘাড়ে হাত রেখে বললো- 'আয় ক্লাব ঘরে আয়'।

হাঁদা ভয় পেয়ে বললো- 'না না মিন্টুদা আমার কাজ আছে।'

'আরে কাজ পরে করবি। আয় না।'- হাঁদার উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করে মিন্টুদা প্রায় টানতে টানতে হাঁদাকে নিয়ে এলো ক্লাব ঘরে। কিন্তু ক্লাব ঘরে ঢুকেই চমকে উঠলো ও। এ কি!!!!!


ক্লাব ঘরের মাঝে বসে ভোঁদা চোখ কান নাক বুজে খিঁচুড়ি খাচ্ছে। মুখে চোখে চরম তৃপ্তি। এই সেরেছে। মিন্টুদা হাসি হাসি মুখে ভোঁদা কে জিজ্ঞাসা করলো - 'খিঁচুড়িটা কেমন রে ভোঁদা?' ভোঁদা খেতে খেতেই উত্তর দিলো - 'দারুন দারুন'

-'হাঁদা বলছিলো, ও তোকে নাকি কালীপুজোর চাঁদা দিয়ে গেছে'

-'আমাকে!! কই, না তো।'

ভোঁদা আবার খেতে শুরু করে দিলো। মিন্টুদা হাসি হাসি মুখে তাকালো হাঁদার দিকে। হাঁদা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো খানিক্ষণ।

মিন্টুদা হঠাৎ চিৎকার করে বললো- 'কত টাকা লাগবে মূর্তি আনতে তুই জানিস? চাঁদা না দিলে কী ভাবে হবে এসব? তুই সত্যি বললে কম টাকা হয়তো নিতাম কিন্তু মিথ্যে বলেছিস তাই মূর্তি আনার গোটা গাড়ি ভাড়া তোকেই দিতে হবে'।


ক্লাবের সবাই তাকিয়ে আছে মিন্টুদার দিকে। রাগে লাল হয়ে উঠেছে মিন্টুদার গাল। হাঁদা চুপ। সবাই চুপ। একদম নিস্তব্ধ।

ভোঁদাটা এমনই গরু, যে সেই সময় হে হে করে হেসে উঠে বললো - 'হে হে হে, বেশ করেছ মিন্টুদা। হাঁদাটার এমনই হওয়া উচিত। আমি তোমার দলে। আমায় আর একটু খিঁচুড়ি দিও তো। জয় মা কালী'

হাঁদা অবাক হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো- 'আজ রাতেই দিয়ে যাব টাকা'।


বাড়ি ফিরে কিছুতেই কোনো সমাধান মাথায় আসছিল না হাঁদার। কী যে করা যায়! এখন একজনই আছে যে বাঁচাতে পারলেও বাঁচাতে পারে। টাকা ধার নিয়ে শোধ করে দেওয়া যাবে না হয় পরে। এমন ভাবে হাঁদা পকেট থেকে ফোন বার করে কল লাগলো।

- 'হ্যালো'।

- 'হ্যাঁ হ্যালো'।

- 'হ্যাঁ বাটুলদা আমি হাঁদা বলছি। একটা সাহায্য করতে পারবে?'

- ' কে হাঁদা? এই আমি তোকে একটু পরে ফোন করছি। এই সামনে একটা ট্রাক উল্টে গেছিল বুঝলি। আমি ট্রাকটা জায়গা মতন পৌঁছে দিয়ে তোকে কল করছি।'


বলে ফোনটা কেটে দিলো বাটুলদা।

'আর তো কোনো পথ নেই। ভোঁদা ফিরুক আজকে। ওর একদিন কি আমার একদিন।'- এই সব ভাবতে ভাবতে হাঁদা একটু বিছানায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে আর খেয়ালও নেই।


ঘুম যখন ভাঙলো তখন বাইরে খুব চিৎকার হচ্ছে। চোখটা একটু পরিষ্কার করে ধাতস্থ হতেই শুনতে পেল বাইরে বেদম স্বরে চিৎকার আসছে - 'জয় মা কালী, কলকাত্তাওয়ালী'।

চিৎকার শুনে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো হাঁদা। কিন্তু বাইরের দৃশ্য দেখে হাঁদা বুঝে পেল না এ কি স্বপ্ন দেখছে না সত্যি?

বাইরে দেখতে পেল বাটুলদা একটা ট্রাক দড়ি বেঁধে একা একা টেনে নিয়ে মণ্ডপের দিকে যাচ্ছে। আর ট্রাকে আছে কলকাতার সবচেয়ে বড় কালী প্রতিমা। সামনে সবাই চিৎকার করছে - 'বলো কালী মাই কি জয়। বাটুলদা জিন্দাবাদ'


হাঁদা হাসবে না কাঁদবে বুঝে পেল না। ক্লাব থেকে ট্রাকের টাকা দিতে বলেছিলো, বাটুলদা গোটা ট্রাকটাই তুলে নিয়ে চলে এসেছে।

গোটা টাকাটাই বেঁচে গেল বাটুলদার জন্যে।


ট্রাকটা টানতে টানতেই বাটুলদা হাঁদাকে জিজ্ঞাসা করলো -


'কিরে? কি সাহায্য লাগবে বলেছিলি?'

হাঁদা হেসে উত্তর দিলো - 'কিচ্ছু না। বলছিলাম খাসি খাবে না পাঠা?'



686 views
  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.