• Blogtog

ছড়াকাটা ভুঁড়িভোজ পাটিপত্রর বদলে প্রিওয়েডিং সাংগিত ব্যাংকুয়েট-বিয়ের সেকাল একাল


বিয়ের ছড়া
নম্রতা সেন

যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং মম এই মন্ত্ৰটির গুরুত্ব একমাত্র যে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে সেই বুঝতে পারবে। যুগে যুগে এই মূল মন্ত্রটি চলে আসছে বর কনেকে মিলিত করার অঙ্গীকার নিয়ে। মূলমন্ত্ৰটি না বদলালেও বিয়ের হালচালে যে আমোঘ পরিবর্তন এসেছে তা বেশ স্পষ্ট। আচার রীতি মেনে চললে হিন্দু মতে বাঙালি বিয়েতে দধিমঙ্গল, শঙ্খ কঙ্কন, গায়ে হলুদ, বরবরণ, সাতপাক, শুভদৃষ্টি, মালাবদল, সম্প্রদান, অঞ্জলি (বর কনে এই প্রথায় খৈ অগ্নি আহুতি দেয় ), সিঁদুর দান এগুলো এখনো মানা হয়ে থাকে। আবার অন্য দিকে সেকালে পাটিপত্র বা পানখিল এর চৰ্চা হতো যা এখন বিশেষ চোখে পরে না।


পাটিপত্র বাঙালি হিন্দু বিবাহের প্রথম আচার। এই আচার লগ্নপত্র বা মঙ্গলাচরণ নামেও পরিচিত। ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ করে বিবাহ স্থির হলে নগদ বা গহনাপত্রে যৌতুক ও অন্যান্য দেনাপাওনা চূড়ান্তভাবে স্থির করার জন্য যে অনুষ্ঠান হয়, তাকেই পাটিপত্র বলে। এই আচারের মাধ্যমেই বিবাহের অন্যান্য আচারের সূচনা ঘটে।



পুরোনো বিয়ের কার্ড


অন্যদিকে পানখিল বাঙালি হিন্দু বিবাহের দ্বিতীয় আচার। এটি পাটিপত্রের ঠিক পরেই পালিত হয়। পানখিলের অর্থ পান পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খিল দেওয়া বা খড়কে বেঁধানো। এই আচারটি প্রথমে বরের বাড়িতে এবং পরে কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পানখিল আচারে বাড়ির মেয়েরা এবং প্রতিবেশিনীরা বিয়ের গান গেয়ে থাকে। এই গানের বিষয়বস্তু হল রাম ও সীতার বিবাহ।


এখন অবশ্য বিয়েতে সংগীত, মেহেন্দির রীতি চালু হয়েছে, যা আগে কখনোই পালিত হতো না।


সেকালে বিয়ে সাধারনত হয়ে থাকতো বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল খাটিয়ে এখনো এই রীতি থাকলেও বেশির ভাগ বিয়েই সম্পন্ন হয় ম্যারেজ হল বা ব্যাংকুয়েট হলে।



প্রিওয়েডিং - বর্তমানে বাঙালি বিয়েতে নতুন যোগ


সেকালের বিয়ের এক অনন্য প্রচলন ছিলো ছড়া কাটা। এই পদ্য লেখার মাধমেই অনেকের আবার কাব্য প্রতিভারও বিকাশ ঘটত। ছাপাখানাতেও নমুনা হিসাবে মিলত পদ্য। স্থান, কাল, পাত্র বদলে একই পদ্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন বিয়েতে ছাপিয়ে দিতেন ছাপখানা মালিকেরা। কোথাও বাবা মা, দাদু দিদিমারা পদ্যে পাত্রীকে কি ভাবে শ্বশুরঘর করতে হবে সেই উপদেশ দিয়েছেন। আবার সমকালীন চালচিত্রও ধরা পড়েছে পদ্যে। কোন কোন পদ্যে দেখা গিয়েছে,


"দেখতে দেখতে ষোলটি বছর করলি যে তুই পার / চললি এবার শ্বশুর ঘরে মোদের ঘর ভরিয়ে আধার।"


বলার অপেক্ষা রাখে না ওই পদ্যই বলে দেয় সেসময় মেয়েদের ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার বিধি নিষেধ ছিল না। সে পদ্যই আজ হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না ওই পদ্যের কথা।আর বিয়ের আসরে ওইসব পদের দেখা মেলে না। খুঁজলে হয়তো পুরনো ছাপখানার তারের ফাইলে ঝুলতে দেখা যাবে রঙবেরঙের পদ্য।

অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিয়ের কেনাকাটাতেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁওয়া । একসময় বিয়ের খবর পেলেই বাড়িতে হাজির হত কাপড়ের বাঁধা ফেরিওয়ালা , স্যাকরার দল । ফরমাইশ মাফিক জামাকাপড় কিংবা গয়না সরবরাহ করত তারা । সেসব আজ ইতিহাস । এখন গ্রাম গঞ্জেই গজিয়ে ওঠেছে নানা কাপড় এবং সোনার দোকান । তা স্বত্ত্বেও বিয়ের কেনাকাটা বিশেষত জামাকাপড় এবং প্রসাধনী সামগ্রী কিনতে মানুষজন নিকটবর্তী শহরেরই ছোটেন । তাই শপিং মলগুলোতে কেনাকাটার প্রবনতা বাড়ছে ।কারণ এক ছাতার তলায় রকমারি বিপণীর ওইসব প্রতিষ্ঠানে একই দিনে পচ্ছন্দমতো জিনিস কিনে ফিরতে পারছেন বিয়েবাড়ির লোকেরা।


এবারে আসা যাক ভোজনের কথায় যা সেকালের থেকে এখন অনেকটাই আলাদা।


"আসুন-বসুন সবাই, আজকে হলাম ধন্য, যৎসামান্য এই আয়োজন আপনাদেরই জন্য।

মাংস, পোলাও, চপ-কাটলেট, লুচি এবং মিষ্টি।

খাবার সময় এদের প্রতি দেবেন একটু দৃষ্টি’"


বাঙালি চিরকাল ই খাদ্যরসিক হিসেবে পরিচিত বিশ্ববাসীর কাছে, কিন্তু সেকাল এবং একালের বিয়ে বাড়ির ভোজনের মধ্যে বিস্তর ফারাক।



পুরোনো ভোজ কার্ড


বিয়ের আগে ভিয়েন বসতো বিয়েবাড়িতে। পান্তুয়া, জিবেগজা, চিত্রকূট, বোঁদে, নিমকি, মিঠাই সন্দেশ নিপুণ হাতে তৈরি করতো হালুইকরেরা। সে মিষ্টি চাখবার জন্য উৎসুক হয়ে থাকতো পরিবারের ছেলেপুলেদের দল।

বনেদি পরিবারের বিয়ের ভোজ হতো একরকমের, পোলাও, কালিয়া, চিংড়ির মালাইকারি, মাছ দিয়ে ছোলার ডাল, রুইয়ের মুড়ো দিয়ে মুগের ডাল, আলুর দম ও ছক্কা। মাছের চপ, চিংড়ির কাটলেট। ইলিশ ভাজা, বেগুনভাজা, শাকভাজা, পটলভাজা, দই, মাছ আর চাটনি। তারপর লুচি, কচুরি, পাঁপড়ভাজা। মিষ্টান্নের একখানি সরায় আম, কামরাঙা, তালশাঁস ও বরফি সন্দেশ। এর উপর ক্ষীর, দই, রাবড়ি ও ছানার পায়েস।


স্বচ্ছল পরিবারের পাশাপাশি সেকালে মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারেও বিয়ে, বউভাতে ভোজের ব্যবস্থা ভালোই ছিল। চমকদারি না থাকলেও সে ভোজে আন্তরিকতার স্পর্শ থাকতো। খাওয়া হতো বাড়ির দালান বা ছাদে সামিয়ানা বেঁধে। আসন, চাটাই পাতা হতো। খাওয়া হতো কলাপাতায় আর জল দেওয়া হতো মাটির গেলাসে। লুচি বা কড়াইশুঁটির কচুরি, কুমড়োর ছক্কা, ডাঁটি সমেত বেগুনভাজা,মাছের মাথা দেওয়া ডাল, মাছের কালিয়া, পাঁঠার মাংস। দই, ক্ষীর, সন্দেশ। নিতান্ত অভাবের সংসারেও মেয়ের বিয়েতে ভাত, ডাল, ভাজা, শুক্তো, ডালনা, মাছের ঝোল খাওয়ানো হতো গ্রামের বাড়ির অতিথিদের।

এখন অবশ্য এই সবই প্রায় ইতিহাস, খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব পরে এখন ক্যাটারিং এর উপরে। নামি কেটারিংয়ের বিরিয়ানি, মোগলাই, চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল খানা পরিবেশন করে তাক লাগিয়ে দেয়া হয় অতিথিদের।


এখান থেকে আমরা কিছুটা হলেও বুঝতে পারি সেকাল ও একালের বিয়ের কতটা বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে।


কৃতজ্ঞতা স্বীকার : অর্ঘ্য ঘোষ, বাংলা নিউস 24


#BengaliMarriage #PreWedding #ThenAndNow

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.