• Blogtog

রূদ্রনাথের গল্প অনসূয়া


রূদ্রনাথের গল্প অনসূয়া
ঋদ্ধিমান ভট্টাচার্য।

গাঢ়োয়ালের এই গ্রামটিকে নিয়ে পূরাণে একটা সুন্দর গল্প আছে। অনসূয়া ছিলেন কর্দমের কন্যা। মহর্ষী অত্রীর সহধর্মিনী। অনসূয়ার সতীত্বে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে স্বর্গ থেকে দেবীরা তাঁদের স্বামীকে পাঠালেন পরীক্ষা নিতে। ছদ্মবেশে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর নেমে এলেন হিমালয়ে,ঋষি অত্রীর কুটিরে এবং অনসূয়া কে জানালেন তাঁরা অনসূয়ার স্তন্যপানের প্রত্যাশী। অতিথিদের অবাঞ্ছিত প্রস্তাবে বিব্রত অনসূয়া স্বামীর স্মরণাপন্ন হলেন। কমন্ডুলের জলে ম্যাজিক্ হল। ছদ্মবেশী ত্রিদেব হয়ে গেলেন শিশু। সমস্যার সমাধান। গল্পের লেজটা অনেক দূরে, কিন্তু মিথ অনুসারী এই গ্রাম বর্ধিষ্ণু না হলেও ছিচকাঁদুনি বৃষ্টি মেখে রূদ্রনাথের পথে একরাত কাটিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে ভুল করে না।



মাতা অনসূয়ার মন্দিরকে ঘিরে সেমওয়াল পরিবারের বাস। ওরাই মন্দিরের পূজারী। মন্দির সংলগ্ন দুটো কামরায় আমাদের রাতের থাকার ব্যবস্থা। অনসূয়া থেকে রূদ্রনাথ ২৮ কিমির পথ। পৌঁছাতে হবে একদিনেই,সেইমতই রেশন প্যাক করা হল। যখন রুকস্যাক গোছাচ্ছি একটা মোটা সোটা কুকুর ঘুরঘুর করছিল। মন্টমরেন্সীর মতন প্যাকিংএ কোন বিঘ্ন ঘটাই নি। কেবল যখন চা খাচ্ছিলাম খানকতক হরলিক্স বিস্কুট মুখে পুরেছিল। প্যাকিং শেষ হতেই নারিন্দর,আমাদের কালকের গাইড, হাজির। ওর কথায় উঠে পড়লাম। প্রায় ২ কিমি হেঁটে গেলাম অত্রীধারায়। প্রপাতের পিছনে একটা গুহাও আছে,ঠিক যেন ফ্যান্টমের খুলি গুহা। ওখানেই রোজ ধ্যানে বসতেন অত্রীমুণি। অমৃতগঙ্গায় পা ভিজিয়ে ফিরে আসতে না আসতেই সন্ধ্যা নামলো। ইলেকট্রিক নেই তাই হলদে নিটোল চাঁদ আর জোনাকির আলোয় রাত নামলো অনসূয়ায়। আমাদের কামরায় মোমের আলো। মন্দিরে তেলের প্রদীপ। মন্দিরের সামনের চাতালের বিশাল ফার গাছ আঁধার আকাশে মিলেয়ে গেছে। শিরশিরানি বাতাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক,সে যেন কত শতাব্দী পিছিয়ে আসা এক মায়াবী রাত। যে রাতে পরীরা নামতো ছায়াপথ বেয়ে।





অ্যালার্মের যান্ত্রিক শব্দে যখন ঘুম ভাঙলো তখনও অনসূয়া ছায়াবৃত্তের আড়ালে ঢাকা। রেশনভরা ঢাউস রুকস্যাক পিঠে হাজির নারিন্দর। ওকে নিয়ে সংখ্যায় আমরা ছয়জন হলেও, উই আর সেভেন। প্রকৃতিও সহযাত্রী। পাইন-খিরশুর জঙ্গলের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, রডোডেনড্রনের গোলাপী আড়ম্বর আর অমৃতগঙ্গার বয়ে চলার জেহাদী সুরে মোহিত বাঙালী মন। নারিন্দর আঙুল তুলে দেখালো, একটা সাইন বোর্ড—“রূদ্রনাথ জানে কা পয়দল মার্গ”। ওই বোর্ডের প্রার ভ্যানিস অ্যারো মার্কটি খুঁজতে গিয়ে পচা পাতায় পিছলে যাওয়ার উপক্রম। নদীর পুল পেরোতেই সবুজ বিপ্লব। বিরাট এক পাইন উল্টে আছে পথের উপর ডালপালা ছড়িয়ে। অগত্যা ডাল বেয়ে উঠতেই হল। সেখানে পুরু পলিট্রিকামের কার্পেট। তাই সেই ভেজা মসের বিছানায় অনেকগুলো শামুক পরিবারের বাস। ওদের ভোরের ঘুম চটকে, হাত পা ছড়িয়ে, খোঁচা খেয়ে ওপারে আসতে হল—পরবর্তী চড়াই ভাঙতে। কিছুটা যেতে এক ঘাস বিছানো সমতল — নাম কান্ডাই বুগিয়াল। প্রাতরাশ সারা হল আর সেই সাথে একটু বিশ্রামও মিলল। কান্ডাই পেরতেই বাড়তে থাকল চড়াই আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল বনের ঘনত্ব। কোমর সমান ফার্নের ঝোঁপ আর চারপাশে ঠেশে ধরা আল্পীয় বৃক্ষরাজি। মাটি এখানে অসূর্যস্পর্শা। আরণ্যক পথে সঙ্গী গাছমছমে গন্ধ আর সজারুর কাঁটার আওয়াজ। দিনেও প্যাঁচার ডাক শোনা যায় । পাকদন্ডী পথে উঠেই চলেছি। এরপরই তো হনসু বুগিয়াল। নারিন্দার কে শুধাই —আর কত দূর?

ছোট্ট উত্তর “থোরা”।


পড়ুনঃ



ও চলেছে তুরন্ত ,আমরা পিছিয়ে পড়ছি। তখন ভারী আক্ষেপ হয় অভিযোজনের দীর্ঘসূত্রতার জন্য—যদি ডানা পেতাম এক জোড়া! বনের ভীড় পাতলা হতেই দেখি রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে। বিরাট এক রাজহাঁস ডানা মেলে যেন উড়ছে। ওপর থেকে হনসু বুগিয়ালকে উড়ে চলা পাখীর মতনই লাগে, তাই নাম হনসু। ঘাসের মখমলে রুকস্যাক নামিয়ে নীল আকাশে তাকিয়ে দেখি একঝাঁক পাখী জলভরা এক মেঘের সমান্তরালে কিচিরমিচির করে উড়ে যাচ্ছে উত্তরে। দিগন্তবিস্তৃত পান্না সবুজ পাহাড়। তবে স্নো লাইন অনেকদূরে।


হনসু পেরিয়ে যখন ধনপাল বুগিয়ালে পৌঁছলাম তখন দুপুর। কিন্তু রোদ ফিকে হয়েছে। মেঘ জমছে। হলদে আর বেগুনী ফুলের গুলশন বুগিয়াল জুড়ে। ক্লান্তি আর মনখারাপের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল পূরাণের গল্প—ধনপতি কুবের তাঁর ঐশ্বর্য্য লুকিয়ে রেখেছিলেন হিমালয়ের এই দূর্গম উপত্যকায়। তীব্র বাতাসে তোলপাড় হয়ে ওঠা এই উপত্যকায় আজ বুঝি সব মনিরত্ন ফুল হয়ে ফুটে আছে। ফুল বিছানো ডাইনিং টেবিলের দুপুরের খাওয়া দাওয়া সারা হল। গা এলিয়ে ঘাসের উপর পড়ে থাকলাম। তাড়া নেই। প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখছি। আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। পরবাশী মেঘ এসে তাড়া দিল। মেঘপিওন ব্যাগের ভিতর থেকে মনখারাপের দিস্তে উড়িয়ে দিল দিকশূণ্যপুরে।





এবার নাওলা পাস। ১৪৭০০ ফুটের হামবড়াই নিয়ে তিনি আছেন। সংকীর্ণ পথ উঠেছে প্রায় ৭০ ডিগ্রী ঢালে। পাশে অতল খাদে মেঘ আর কুয়াশা। হাপড় কাটা ফুসফুস নিয়ে যখন এক্কেবারে শীর্ষে তখন দেখি মাথার উপর মেঘমুক্তির নীল কিন্তু নীচে অনসূয়া ভিজেই চলেছে। নাওলা পাস টপকে পঞ্চগঙ্গা বুগিয়ালে নামতে দেখি উপত্যকার নানাদিক থেকে ছুটে চলেছে তিরতিরে নদী। ঢেউ খেলানো পথের শেষে রূদ্রনাথ মন্দিরের সিঁড়িপথ। বুরাসের বনে ফুল ফুটেছে। শেষের এই পথটুকু যেতে আকাশের সীমানা বরাবর নন্দাদেবী,ত্রিশুল আর দোনাগিরির বিস্তার।


মন্দিরের একটু আগেই নারদ কুন্ড। ২৮ কিমি হেঁটে শেষ পর্যন্ত যখন পৌঁছালাম পঞ্চকেদারের চতুর্থ কেদারে তখন আকাশে লাল। মন্দিরের পুরোহিত মহাশয়ের চোখও লাল তবে তা সোমরসের অনুরাগে। মন্দিরের পাশেই আমাদের থাকার অনুমতি মিলল। সন্ধ্যা আরতীর সময় হল। গুহামন্দিরের ভেতর থেকে ভেসে এল “ঔম রূদ্রশায়ঃ”। ধুনির গন্ধ,পাকানো গোঁফ আর দীর্ঘ দুই চোখে মহেশ্বর সত্যিই রূদ্র। সারাটি পথ পালিয়ে থেকে তিনি ধরা দিলেন। নিকষ অন্ধকারে পাহাড়ে পাহাড়ে মাখামাখি হয়ে গেছে।


রাত বেড়ে চলে। গুহামন্দিরে কোজাগর মহাদেব। আকাশে একচোখ সাইক্লোবের মতন তাকিয়ে থাকে কোন এক তারা।


পড়ুনঃ




Read more from this Writer.

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Instagram

©2019 by Blogtog.